ইরান নিয়ে ট্রাম্পের টানাপোড়েনের মধ্যে উপসাগরীয় নেতাদের কাছে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করল চীন

মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেছে চীন। এই কূটনৈতিক উদ্যোগ এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত বৈঠকের কথা রয়েছে; ট্রাম্পের ১৮ ও ১৯ নভেম্বর চীনের শেনজেনে এপেক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
সোমবার বেইজিংয়ে এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের সঙ্গে আলোচনা করেন সি। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৫০ বছর আগে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর এটিই কোনো ওমানি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম চীন সফর। বৈঠক সম্পর্কে চীনের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, সি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠা উচিত নয়।
সি বলেন, চীন সব সময় সংঘাত বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট সমাধানে প্রজ্ঞা ও সমাধান দিতে আশা করে।
সির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মুসাদ বিন মোহাম্মদ আল আইবান এবং ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপসচিব আলি বাঘেরি কানির সঙ্গে বৈঠক করেন। আলাদা আলোচনার পর ওয়াং বলেন, চীন এই অঞ্চলকে সংঘাতের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে ও স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক। বাঘেরি কানির সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং বলেন, চীন ইরানকে তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সমর্থন করে। চীনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, তার দেশ আশা করে চীন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শান্তিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালালে চীন তেহরানকে পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি আলোচনার দিকে ঠেলে দেওয়ার কৃতিত্ব পায়, যা আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির মর্যাদা বাড়ায়।
সাংহাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক শেন ডিংলি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের প্রভাব আর আগের মতো নেই; তবে এই অঞ্চলে চীনের বর্ধিত বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের কারণে এর প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না।
যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার পরও চীনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা তুলনামূলক ম্লান ছিল। ইরানের ওপর বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব হলো, দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কেনে। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে চীন তার অপরিশোধিত তেল আমদানি ৩০ শতাংশ কমায়, জুনে মোট আমদানি এক দশকের সর্বনিম্নে নেমে যায়। কিছু হিসাব অনুযায়ী, চীনের তেল আমদানি কমানো বিশ্বব্যাপী মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ৩০ ডলার বা তার বেশি কমাতে সাহায্য করে।
বেইজিং অন্যদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় খুব কমই ভূমিকা রেখেছে; এর একটি কারণ হলো, দেশটি এই সংঘাত সমাধানকে নিজের দায়িত্ব মনে করে না। মার্চে ওয়াং বলেছিলেন, এই যুদ্ধ কখনোই হওয়া উচিত ছিল না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা জনসমর্থন পাবে না।
লড়াই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সুনামে যে ক্ষতি করেছে, তার সুবিধাভোগীও চীন। জুলাইয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, জরিপ করা ৩৬টি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে বেশি অনুকূলভাবে দেখা হয়।
বিশ্বের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের যন্ত্রণা চীনের অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। জ্বালানি ঘাটতি মূল্যস্ফীতি ঘটায়, যা চীনা পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা কমানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে নিবিড় আলোচনায় রয়েছে, যার মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নতুন করে শুরু করার হুমকি বারবার দিয়েছেন ট্রাম্প, যা বেইজিংয়ে উদ্বেগ তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ট্রাম্পের মরিয়া ভাব চীনকে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগও দিতে পারে।




