দিল্লির রেস কোর্স এলাকা থেকে উচ্ছেদ ৭১৭ পরিবার, মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুনানি ১৬ ডিসেম্বর

ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে সামান্য দূরে ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মসজিদ। এর ফ্যাকাশে দেয়াল ও সুচালো খিলান এখনো অটুট, আঙিনায় এখনো বিছানো সবুজ ও সাদা টাইলস। কিন্তু যে মানুষগুলো এই জায়গাটিতে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন, তাঁরা আজ আর সেখানে নেই।
পঞ্চাশ বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াসিম ধ্বংসস্তূপের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছেন, ঠিক কোথায় একসময় তাঁর বাড়িটি ছিল। পেশায় গাড়িচালক ওয়াসিম বলেন, তাঁর বাবার বিয়ে হয়েছিল ওই জায়গায়, এর কয়েক দশক পর তাঁর মেয়ের বিয়েও হয়েছিল সেখানেই।
ওয়াসিম ও তাঁর পরিবার ছিল সেই শত শত মানুষের অংশ, যাঁরা এই মসজিদের চারপাশে ছোট ছোট ঘর বানিয়ে বসবাস করতেন। দিল্লির অন্যতম ধনী ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ‘রেস কোর্স’ এলাকায় সামরিক স্থাপনা, অভিজাত ক্লাব ও বিশাল বাংলোর মাঝখানে গড়ে উঠেছিল তাঁদের বসতি। তাঁদের অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বাস করে আসছিলেন এবং আশপাশের ধনী পরিবারগুলোর বাড়িতে গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা মালি হিসেবে কাজ করতেন।
গত ৭ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ তিনটি বসতি এলাকার সব ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সরকারি জমিতে অবৈধভাবে এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সামরিক স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় এসব বসতি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়।
প্রায় ৭১৭টি পরিবারকে শহর থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরে শহরতলির সাভদা ঘেভরা নামের একটি কলোনিতে স্থানান্তর করা হয়।
বাসিন্দারা এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, কর্মস্থল, স্কুল ও পরিচিত সমাজ থেকে এত দূরে চলে গেলে তাঁদের জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তবে আগস্ট মাসে আদালত এই স্থানান্তরের অনুমতি দেয়; আদালত সরকারের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয় এবং উল্লেখ করে যে, তাঁদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেবল মসজিদটি এবং কাছাকাছি একটি হিন্দু মন্দির অক্ষত রয়ে গেছে। তবে সেদিনই সেগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং এলাকাটিতে প্রবেশ সীমিত করে ফেলা হয়। সাধারণত উপাসকদের গেট থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যদিও কেউ কেউ প্রহরীদের কাছে অনুনয় করলে মাঝেমধ্যে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পান।
সরকারের দাবি, যে জমিতে মসজিদটি অবস্থিত, তা তাদের মালিকানাধীন। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে এটিকে ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’—অর্থাৎ ইসলামি আইন অনুযায়ী ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত জমি বা ভবন—হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছিল এবং এটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের মতে, মসজিদটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো; যদিও অন্য হিসাব অনুযায়ী এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছর হতে পারে।
মসজিদটিতে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ আবার চালুর অনুরোধ জানিয়ে এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে ওয়াকফ বোর্ড। এছাড়া একজন মুসল্লি উচ্চ আদালতে একটি আবেদন করেছেন, যেখানে তিনি নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ এবং মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
গত ২৯ অক্টোবর সরকার আদালতকে জানায়, বোর্ডের আপত্তিগুলো বিবেচনা করার সময় তারা চার সপ্তাহ পর্যন্ত মসজিদটির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে না। ধ্বংসযজ্ঞ চলার সময় নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তারা সেখানে আবার নামাজ পড়ার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে। তবে উপাসকদের আইনজীবী এই অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ১৬ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করে।
ওয়াসিম সুযোগ পেলেই এখনো নামাজ পড়তে মসজিদে যান, যদিও কখনো কখনো প্রহরীরা তাঁকে ফিরিয়ে দেন। সম্প্রতি এক বিকেলে মসজিদের ভেতরে যে চার-পাঁচজন উপাসক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বাইরে একটি জেনারেটর চলছিল। তিনি বলেন, তাঁদের হৃদয় ও পুরো জীবন এই জায়গাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে; শৈশব যেখানে কেটেছে, সেই জায়গাটিকে তাঁরা কীভাবে ছেড়ে দেন।
রেখা নামের এক বিধবা নারী সেই কলোনির কথা স্মরণ করেন। তিনি আশপাশের বাড়িতে বাসন মাজার কাজ করতেন, নিজের পরিবারকে বড় করেছেন এবং স্থানীয় মন্দিরে ‘সেবা’ বা স্বেচ্ছাসেবী কাজ দিতেন। তাঁর কাছে ‘পুনর্বাসন’ শব্দটি অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও বেদনাদায়ক মনে হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, দশক ধরে গড়ে তোলা একটি জীবনকে কীভাবে উপড়ে নিয়ে অন্য কোথাও নতুন করে বসানো সম্ভব।
স্থানান্তরের পর থেকে রেখা তাঁর জীবিকার উৎস হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর ১৯ বছর বয়সী ছেলেটি কাজ পাওয়ার জন্য হিমশিম খাচ্ছে। তাঁকে একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পায়ে অস্ত্রোপচারের পর সেখানে একটি ধাতব রড বসানো থাকায় সিঁড়ি বেয়ে ওঠা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তিনি বলেন, হয়তো তাঁর একটি ঘর আছে, কিন্তু তাঁর আসল বাড়িটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই অভিজ্ঞতাগুলো দিল্লিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা উচ্ছেদ বা স্থানচ্যুতির ইতিহাসেরই একটি অংশ। শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে বারবার শহরের দূরবর্তী প্রান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কারণ তাঁদের কাছে এমন কোনো নথিপত্র নেই, যা দিয়ে তাঁরা কয়েক দশক ধরে বসবাস করা জমির আইনি মালিকানা প্রমাণ করতে পারেন।
নগর গবেষক মুক্তা নায়েক বিবিসিকে বলেন, স্থানান্তরের ফলে তাঁরা তাঁদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগ—উভয় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যার পরিণতিতে তাঁদের জীবিকা ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাজের সন্ধানে পরিবারগুলো যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাঁদের আগের অনানুষ্ঠানিক সহায়তাব্যবস্থাগুলো পুনরায় গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও তিনি বলেন। তাঁর ভাষায়, এর ফলে পরিবারগুলো নিজেদের ভাগ্য নিয়ে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় পড়ে যায়।




