বকেয়া বিলের জেরে শতাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল লেবানন
লেবাননের জ্বালানি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বকেয়া বিল পরিশোধ না করা প্রায় ১০০টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া শুরু করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, সোমবার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে শুরু করেছে।
এই পদক্ষেপকে জ্বালানিমন্ত্রী জো সাদ্দির সঙ্গে সরকারের চলমান বিরোধের আরও তীব্র রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার তাঁর দাবি—বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো, জ্বালানি খরচের বোঝা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানির অনাদায়ী বিল নিষ্পত্তি—পূরণে ব্যর্থ হয়েছে অভিযোগ তুলে সাদ্দি সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠক বর্জন শুরু করেছেন।
লেবাননে বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ সংকট চলছে। তবে ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সংকটের পর রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ তীব্রভাবে কমে গেছে। রাজধানী বৈরুতে একসময় দিনে প্রায় ২১ ঘণ্টা রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ মিলত; এখন তা কমে দিনে মাত্র দুই থেকে চার ঘণ্টায় নেমেছে, কোনো কোনো দিন একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না।
নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় সরবরাহ না থাকায় দেশটিতে একটি বিকল্প অর্থনীতি গড়ে উঠেছে—মানুষ নির্ভর করে বেসরকারি জেনারেটরের ওপর, যার অনেকগুলোই চালান রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা।
লেবাননের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জেসিকা ওবেইদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা দুর্নীতি। তাঁর ভাষায়, এই খাতের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলজুড়ে দুর্নীতি রয়েছে এবং এর পরিমাণ বিলিয়ন ডলারের হিসাবে—যা রাতারাতি দূর হওয়ার নয়।
ওবেইদ আরও বলেন, লেবানন খুব ব্যয়বহুল ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল এবং রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অনেক পুরোনো। ফলে সাময়িক সমাধানে কাজ হবে না; দেশটির জন্য কোন ধরনের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাই, সেই দীর্ঘমেয়াদি ভাবনাই এই খাতে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে সংস্কারপন্থী একটি সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতির উন্নতির আশা জেগেছিল। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো অপ্রতুল, আর জ্বালানি খরচ ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে লাফিয়ে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এ বছর লেবাননে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়াবে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশে।
বিদ্যুৎ নিয়ে এই বিরোধে মন্ত্রিসভায় রদবদল এবং সাদ্দির পদত্যাগের জল্পনা জোরালো হয়েছে। ডানপন্থী লেবানিজ ফোর্সেস (এলএফ) দলের সদস্য সাদ্দি লেবাননের গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি এ বছরের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের সরকারকে তাঁর মন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চাপ দিচ্ছিলেন; তবে মার্চের শুরুতে লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ তীব্র হলে তিনি চাপ কমিয়ে দেন।
অক্টোবরে খসড়া ২০২৭ বাজেট ঘোষণার পর এলএফ ও সাদ্দি আপত্তি তোলেন—তাঁদের দাবি, বিদ্যুৎ খাতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সাদ্দি তাঁর মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনের দিকে নজর টানার চেষ্টা জোরদার করেছেন। অক্টোবরের শুরুতে তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠক বর্জনের ঘোষণা দেন; গত বৃহস্পতিবার তাঁর দলের আরও তিনজন মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে বৈঠক বর্জন করেন।
বৈরুতভিত্তিক থিংক ট্যাংক দ্য পলিসি ইনিশিয়েটিভের অর্থনীতিবিদ সামি জুগাইব মনে করেন, এই বর্জন সাদ্দি ও তাঁর দলের একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ—জনসমর্থন হারানো এড়ানোর চেষ্টা। তাঁর ভাষায়, মানুষের চোখে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এই মন্ত্রণালয় আবার পাওয়া তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে যাবে।
সংকটের মধ্যে লেবাননের পাশে এসেছে কাতার। গত মাসে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জাসিম আল থানি বৈরুত সফরে একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ জ্বালানি অংশীদারত্বের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেন। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, দোহা আগামী তিন বছরে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ২০ বছর মেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি অনুমোদিত হলেও লেবাননের বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়; প্রয়োজনে পুরো গ্রিড নতুন করে গড়তে হতে পারে। জুগাইব বলেন, পুরোনো অবকাঠামো নিয়ে আগের ভর্তুকিনির্ভর মডেলে ফেরা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়—সরকারের কাছে সেই অর্থই নেই। টেকসই সমাধানের জন্য পুরো খাতের সংস্কারই একমাত্র পথ।




