হার্ভার্ডে ভর্তির মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে প্রতারণা, ইসলামাবাদে পদার্থবিজ্ঞানের স্বর্ণপদকজয়ী তরুণীর মৃত্যু
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকার রানা মালিক সেন্টার নামের একটি দুগ্ধপণ্যের দোকানের ওপরের ফ্ল্যাটে তিন দশকের বেশি সময় ধরে পরিবার নিয়ে থাকেন রানা মুহাম্মদ ইজাজ। তাঁর কনিষ্ঠ মেয়ে লাইবা ইজাজ প্রতিদিন সকালে ও রাতে ঘুমানোর আগে তাঁকে চা বানিয়ে দিতেন। বাবা বলেন, লাইবা চলে যাওয়ার পর তিনি সবকিছুই মিস করেন।
লাইবা ইজাজ (২৪) সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ (আইআইইউআই) থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। গত ৯ অক্টোবর বাড়ির কাছে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশের মামলার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে লাখ লাখ রুপি প্রতারণা করার পর লাইবা সম্ভবত আত্মহত্যা করেছেন।
প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত মুহাম্মদ নোমানকে দুই দিন পর গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। পুলিশ বলেছে, তাঁর সহযোগীরা তাঁকে ছিনিয়ে নিতে গুলি চালিয়েছিল।
গত ২১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি পরিবারটির সঙ্গে দেখা করে নোমানের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা যে অর্থ জানিয়েছেন, সেই ৫০ লাখ রুপির বেশি (১৮ হাজার ডলার) তাঁদের হাতে তুলে দেন।
ইজাজ নিজে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং তাঁর স্ত্রী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন, কিন্তু তাঁদের চার মেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। দুই বোন গণিত পড়েছেন, আর লাইবার এক বড় বোন বৃত্তি নিয়ে এক বছর চীনে থেকে ম্যান্ডারিন শিখেছেন। লাইবাও বৃত্তি নিয়ে পড়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক জিতেছেন; বাবা বলেন, যেদিন তিনি পদক পান, সেদিন লাইবা বোনদের সামনে নেচে ও লাফিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন।
লাইবা পরে ইসলামাবাদের একটি স্কুলে বিজ্ঞান পড়াতেন এবং দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিশুদের বাড়িতে পড়াতেন। আইআইইউআই তাঁকে সৌদি আরবে পড়ার বৃত্তি দিয়েছিল, কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে চেয়েছিলেন বলে বাবা জানান।
এ বছর ইসলামাবাদের প্রধান ব্যবসায়িক এলাকা ব্লু এরিয়ার একটি কল সেন্টারে কাজ করার সময় লাইবার সঙ্গে নোমানের পরিচয় হয়। সেখানে দেরি করে কাজ করতে হতো এবং সহকর্মীদের বেশিরভাগই ছিলেন পুরুষ; এই কর্মপরিবেশ নিয়ে অস্বস্তিতে থাকা বাবা তাঁকে চাকরি ছাড়তে উৎসাহ দেন এবং লাইবা চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর নোমান তাঁর দোকানে দুধ ও দই কিনতে আসতে শুরু করেন এবং লাইবার সৌদি আরবে পড়ার পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞাসা করেন। নোমান নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের কর্মী বলে দাবি করেন, একটি সার্ভিস কার্ড দেখান এবং বলেন, সরকারি কর্মচারী হওয়ায় তাঁর লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই।
পরিবারটি প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাবদ ২২ লাখ রুপি (৭ হাজার ৯০০ ডলার) কিস্তিতে পরিশোধ করে বলে ইজাজ জানান। পরে নোমান দাবি করেন, হার্ভার্ডের জন্য ৭২ লাখ রুপি (২৫ হাজার ৯০০ ডলার) তহবিলের প্রমাণ দেখাতে হবে এবং ডলারে রূপান্তরের জন্য সেই অর্থ তাঁর অ্যাকাউন্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। মেয়েকে সাহায্য করতে ইজাজ নিজের একটি জমি ও পরিবারের গহনা বিক্রি করেন।
পরিবারের হাতে থাকা নথিতে হার্ভার্ডের অফার ও বৃত্তির চিঠি, সরকারি চেহারার সিলসহ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ফরম, নিউইয়র্কের এক আত্মীয়ের স্পনসর হলফনামা, লাইবার ছবিসহ দূতাবাসের রেকর্ড এবং বোস্টনগামী বিজনেস ক্লাসের টিকিট ছিল বলে দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে হাতে পাওয়া চূড়ান্ত ফাইলে লাইবার নামে একটি ব্যাংক বিবরণী এবং ১২ অক্টোবরের ভিসা সাক্ষাৎকারের তারিখও ছিল বলে ইজাজ জানান।
অক্টোবরের শুরুতে সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতে সাহায্যের জন্য ইজাজ নোমানকে ফোন করলে তিনি বলেন, তিনি কোয়েটায় আছেন এবং পরদিন ফিরবেন। তাঁর এড়িয়ে যাওয়া আচরণে সন্দেহ হলে পরিবার নথিগুলো একজন ট্রাভেল এজেন্টকে দেখায় এবং জানতে পারে বোস্টনের টিকিটটি ভুয়া। প্রতিবেশী একজন আইনজীবী ফাইলটি পরীক্ষা করে বলেন, কোনো নথিই আসল নয়। ইজাজ জানান, ৬ অক্টোবর তাঁরা সত্য জানতে পারেন।
৯ অক্টোবর জুমার নামাজের জন্য দোকান বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইজাজ, তখন লাইবা বলেন নোমান তাঁকে বার্তা পাঠিয়েছেন; তিনি এলাকার মসজিদে নামাজ পড়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। বাবা তাঁকে ঘরে থাকতে বলেন এবং স্ত্রীকেও তা নিশ্চিত করতে বলেন। তিনি ফিরে এসে জানতে পারেন, মায়ের বাধা সত্ত্বেও নোমানের বার্তা পেয়ে লাইবা বেরিয়ে গেছেন। লাইবার ভগ্নিপতি জায়েদ বিন আফজাল ও এক ছোট ভাই তাঁকে খুঁজতে যান; এক বোন একটি অ্যাপ দিয়ে তাঁর ফোনের অবস্থান বাড়ির কাছের একটি এলাকায় শনাক্ত করে দেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুই ঘণ্টারও কম সময় পর, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাঁরা লাইবার মরদেহ পান। জায়েদ পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আগ্রহী পাকিস্তানিদের সংখ্যা বাড়ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের ওপেন ডোর্স প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৩ হাজারের বেশি পাকিস্তানি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি ছিলেন, যা ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) বলেছে, নোমান নিবন্ধিত ভিসা এজেন্ট ছিলেন না। শিল্প সংগঠন অল পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন অব ফরেন এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টসের মতে, সরকার শিক্ষা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে না। লাহোরের কলেজওয়ার্কস নামের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা নুশমিয়া সুখেরা বলেন, শিক্ষা পরামর্শদাতাদের যাচাই বা নিবন্ধন করে এমন কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কথা তিনি জানেন না, এবং কোনো শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভর্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
লাইবার মৃত্যুর পরদিন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নোমানকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। পুলিশ ও এফআইএ পৃথক মামলা করে। পুলিশ জানায়, ২০ অক্টোবর প্রমাণ উদ্ধারে নোমানকে নিয়ে যাওয়ার সময় দুটি মোটরসাইকেলে চারজন গুলি চালায়; পুলিশের ভাষ্য, তারা নোমানকে পালাতে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু গুলি নোমানের গায়ে লাগে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ওই হামলার তদন্ত চলছে, এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, লাইবার মৃত্যুর তদন্ত চলছে; ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্য আত্মহত্যার দিকে ইঙ্গিত করেছে এবং ফুটেজে দেখা গেছে লাইবা হাতে ফোন নিয়ে একা বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন। ফরেনসিক প্রতিবেদনের বাকি অংশ পেতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিন লাগে। তবে পরিবার আত্মহত্যার দাবি মানতে রাজি নয়। জায়েদ বলেন, লাইবা নিজে এটা করতে পারেন না; তাঁর ভাষায়, নোমানই তাঁকে হত্যা করেছে।

