বাড়িতে প্রসবের পর মায়ের মৃত্যু: অস্ট্রেলিয়ায় ‘বার্থকিপার’-এর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের সম্ভাবনা

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে বাড়িতে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর এক মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় শুনানিতে বলা হয়েছে, ওই প্রসবে সহায়তাকারী ‘বার্থকিপার’ এমিলি লালকে প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠানো হতে পারে এবং তিনি ফৌজদারি অভিযোগের মুখে পড়তে পারেন। ভিক্টোরিয়ার করোনার আদালতে সোমবার এই মামলার সমাপনী যুক্তিতর্কে এ কথা উঠে আসে।
নিহত মায়ের নাম স্টেসি ওয়ার্নেক। ৩০ বছর বয়সী এই পুষ্টিবিদ ও ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মেলবোর্নের ফ্র্যাংকস্টন হাসপাতালে মারা যান। বাড়িতে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই প্রসবের সময় পাশে ছিলেন বার্থকিপার এমিলি লাল, যাঁকে গর্ভাবস্থাজুড়ে সহায়তার জন্য ৬ হাজার ডলার দিয়েছিলেন ওয়ার্নেক।
আদালতে বলা হয়েছে, বার্থকিপারদের কোনো ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ থাকে না এবং তাঁরা চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে কাজ করেন। ওয়ার্নেকের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত (ইনকোয়েস্ট) শুরু হয়েছিল গত জুনে, তবে তাঁর ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণের কারণে করোনার থেরেস ম্যাকার্থির কাছে সমাপনী বক্তব্য পিছিয়ে যায়।
সোমবার শুনানি আবার শুরু হলে করোনারকে সহায়তাকারী কৌঁসুলি র্যাচেল এলিয়ার্ড বলেন, সম্পন্ন হওয়া ফোন বিশ্লেষণে অনেক বার্তা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্রিবার্থ’ বেছে নেওয়া নারীদের জন্য লালের সমন্বয়ে চালানো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চ্যাট। ওয়ার্নেক ও লালের মধ্যে একটি ফোনালাপও আদালতে বাজিয়ে শোনানো হয়।
এলিয়ার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনের এই প্রমাণ লালের জুনে দেওয়া সাক্ষ্যের সঙ্গে মেলে না। লাল বলেছিলেন, ওয়ার্নেক তাঁকে মূলত সহায়ক বন্ধুর ভূমিকায় নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং টাকাটা মূলত তাঁর সময়ের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শের জন্য নয়। কিন্তু এলিয়ার্ড বলেন, ‘মিস লাল তাঁর মক্কেলদের এমনভাবে প্রস্তুত করতেন যেন তাঁরা প্রসবের সময় চিকিৎসা সহায়তা নেওয়ার, ব্যথানাশক নেওয়ার বা হাসপাতালে যাওয়ার প্রলোভন প্রতিরোধ করতে যথেষ্ট শক্তিশালী হন।’
এলিয়ার্ড আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে মিস লাল মনে করতেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাসপাতালে যাওয়া মানে ব্যর্থতা—যে কাজটা বোঝেনি, প্রসবের তীব্রতা কেমন হবে তা যার যথেষ্ট ধারণা হয়নি, সেই হাসপাতালে যায়।’ ওই ফোনালাপে ওয়ার্নেক লালকে বলেছিলেন, তিনি প্রথম সন্তান জন্মের সময় পাশে একজন ‘জ্ঞানী নারী’ চান, যিনি তাঁকে পথ দেখাবেন—তিনি যেন জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘আমি কি মারা যাচ্ছি, নাকি ঠিক আছি?’
ওয়ার্নেক লালকে বলেছিলেন, তিনি হাসপাতালকে ভয় পান। জবাবে লাল বলেন, ‘হাসপাতালকে তোমার ভয় পাওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা ভয়ংকর একটা জায়গা। আমার নিজের কাছে মনে হয়, বাড়িতে থেকে সন্তান জন্ম দেওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো তোমার মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অবস্থা এতটাই মজবুত থাকতে হবে।’ লাল ওয়ার্নেককে আরও বলেছিলেন, বাড়িতে প্রসবে যাওয়া ধাত্রীরা কখনো কখনো অনিচ্ছায় প্রসব নষ্ট করে দেন, কারণ প্রসব দীর্ঘ হলে তাঁরা নারীকে হাসপাতালে যেতে বলেন—কখনো শুধু এই কারণে যে ধাত্রী নিজে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
লাল এর আগে আদালতকে বলেছিলেন, তিনি ক্লিনিক্যালভাবে প্রশিক্ষিত নন, ওয়ার্নেকের প্রসব নিরাপদ করা তাঁর দায়িত্ব ছিল না, এমনকি নির্দিষ্ট করে না বললে অ্যাম্বুলেন্স ডাকাও তাঁর কাজ ছিল না। তিনি বলেছিলেন, তিনি ওয়ার্নেককে কোনো চিকিৎসা পরামর্শ দেননি, শুধু নিজের সন্তানদের ফ্রিবার্থের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।
এলিয়ার্ড সোমবার বলেন, ফোনালাপ ও ওয়ার্নেকের ফোন থেকে পাওয়া বার্তা ও নথি অনুযায়ী, ফ্রিবার্থের সময় লাল যে ভূমিকা পালন করবেন বলে ওয়ার্নেক ভেবেছিলেন, তা ছিল তাঁকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করা। তিনি বলেন, ‘স্টেসি মিস লালের ওপর যথেষ্ট নির্ভর করছিলেন, তাঁর ওপর যথেষ্ট আস্থা রেখেছিলেন। মিস লাল ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি পরামর্শ দিচ্ছিলেন। রেফারেল দিচ্ছিলেন। সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করছিলেন। মন্তব্য করছিলেন।’ এলিয়ার্ডের মতে, এসব শুধু চুল টেনে ধরা ও কপাল মুছে দেওয়া বন্ধুর ভূমিকার সঙ্গে মেলে না; এটি ছিল অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ ও পরিকল্পিত। তিনি আরও বলেন, ওয়ার্নেকের স্বামী নাথানকেও আশ্বস্ত বা প্রভাবিত করা হয়েছিল যেন তিনি শুধু পাশে বসে সমর্থন দেন এবং স্টেসি যা অনুভব করছেন তা ঠিক আছে বলে মনে করেন।
ফোন বিশ্লেষণের পর লালকে আবার সাক্ষ্য দিতে আদালতে ফিরতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে শুনানিতে জানানো হয়। এর আগে তিনি শুধু এই শর্তে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে করোনার তাঁকে সুরক্ষার সনদ দেবেন, যাতে তাঁর সাক্ষ্য ভবিষ্যতে কোনো কার্যক্রমে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা না যায়। এলিয়ার্ড করোনারের কাছে বলেন, লাল মিথ্যা সাক্ষ্য (পারজারি) করেছেন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং তাঁকে অফিস অব পাবলিক প্রসিকিউশনসের (ওপিপি) কাছে পাঠানো করোনারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই দপ্তরই পরিচালকের পক্ষে ফৌজদারি মামলা প্রস্তুত ও পরিচালনা করে।
আদালতে এর আগে শোনা গেছে, প্লাসেন্টা জন্ম দেওয়ার পর ওয়ার্নেক দেড় লিটার পর্যন্ত রক্ত হারান এবং শ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হলে লাল তিনবার জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে চান কি না। লাল এর আগে বলেছিলেন, মক্কেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা তাঁর কাজ নয়, এমনকি নারী অচেতন ও মুমূর্ষু হলেও নয়। তৃতীয়বার ওয়ার্নেক হ্যাঁ বলেন, কিন্তু প্যারামেডিকরা পৌঁছানোর আগেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন; ব্যাপক প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে ভুগছিলেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালে তিনি মারা যান; তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে হাসপাতালের রক্তের মজুত শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এলিয়ার্ড সোমবার বলেন, ‘স্টেসি হাসপাতালে থাকলে বেঁচে যেতেন।’ তিনি বলেন, সুসজ্জিত দেশগুলোতে ধাত্রী ও চিকিৎসকেরা জানেন প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ প্রসবের সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা এবং এটি শনাক্ত ও চিকিৎসায় তাঁরা এতটাই প্রশিক্ষিত যে হাসপাতালে নারীরা এতে মারা যান না। এলিয়ার্ড আরও বলেন, বাড়িতে নিবন্ধিত ধাত্রীর সঙ্গে জন্ম দিলেও ওয়ার্নেক বেঁচে যেতেন; তাঁর জটিলতাটি ছিল পরিচিত এবং তাৎক্ষণিক শনাক্ত ও সাড়া পেলে সহজেই চিকিৎসাযোগ্য। করোনার পরবর্তী তারিখে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন।



