মেরাদিয়া বাজারে মাছ কিনতে হিমশিম ক্রেতারা, টেংরা চাওয়া হচ্ছে ৭৫০ টাকা কেজি

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে ঢাকার মেরাদিয়া বাজারে বাজার করতে আসেন নাজিয়া রহমান নামের এক অভিভাবক। মাছের বাজারে এসে এপাশ-ওপাশ ঘুরে মাছ দেখছিলেন তিনি, কিন্তু দামে মিলছিল না।
নাজিয়া রহমান বলেন, তিনি ছোট মাছ কেনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু দামে মিলছে না। টেংরা মাছ ৭৫০ টাকা কেজি চায়, ৭২০ টাকা হলে দেবে বলছে। মলা মাছ প্রায় ৫০০ টাকা কেজি চাচ্ছে, আর ছোট পুঁটি মাছের দামও ৩০০ টাকার ওপরে চায়। তাঁর ভাষায়, কোনটা কিনবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, যেভাবে দাম বাড়ছে, তাতে কী মাছ খাবেন, আগে চিন্তা করতে হয়। ছেলে-মেয়ে রুই, পাঙাস কিংবা তেলাপিয়া আর কত খাবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, তাঁদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবার একটু ভালো খেতে গেলে আগে-পিছে অনেক ভাবতে হচ্ছে; একদিন ছেলে-মেয়েকে পোলাও-রোস্ট খাওয়ালে এক মাস আর তা খাওয়ার চিন্তা করা যায় না।
নাজিয়া রহমান জানান, তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়েসহ পরিবারে সদস্য চারজন। স্বামী বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তাঁর আয়ে বাড়িভাড়া, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, খাওয়া ও ঠিকমতো ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয় না, আবার গ্রামের বাড়িতে স্বজনদেরও দেখতে হয়। সব মিলিয়ে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, বাজারের নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাঁরা আর পেরে উঠছেন না, আর ছেলে-মেয়ের ইচ্ছে পূরণ করতে না পারলে নীরবে কাঁদতেই হয়।
নাজিয়া রহমানের সঙ্গে বাজার করতে আসা আয়েশা বেগম বলেন, সবচেয়ে কষ্টে আছে তাঁদের মতো পরিবারগুলো। যাদের মাসিক আয় ৪০ হাজারের মতো, তারা আছেন উভয় সংকটে; তারা না পারে খারাপ জায়গায় থাকতে, না পারে খারাপভাবে চলতে। তাঁর ভাষায়, এরাই এখন ঢাকা শহরে বুকচাপা কান্নায় রয়েছেন। আবার যারা দরিদ্র, তারাও যে ভালো আছেন, এমনটা নয়; তারাও যে দুবেলা ভালো খাচ্ছেন বা ভালো পরছেন, এমনটা না।
বাজারের মাছ বিক্রেতা মিন্টু বলেন, তাঁদের করার কিছু নেই। তিনি তাজা রুই-কাতলা বিক্রি করেন। এই মাছগুলো সাধারণত উত্তরাঞ্চল থেকে আসে। আগে তিনি এই মাছ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, আর বড় আকারেরগুলো ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন, কিন্তু এখন দাম ৩৬০-৩৮০ টাকা থেকে শুরু। তাঁদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, আর মাছ ঢাকায় আনতে আগে যে খরচ হতো, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ। তাঁর ভাষায়, তাঁরা তো মাছ লোকসানে বিক্রি করবেন না, আবার বেশি লাভও করতে পারেন না; মাছ বিক্রি করলেও তাঁকেও তো খেতে হয়, ফলে অন্য সবার মতো তিনিও ভুক্তভোগী।
এদিকে বাজারে সবজির দাম আজ অপরিবর্তিত রয়েছে। পটল ৬০, আলু ৩৫, করলা ৮০-১০০, কাকরল ৮০, ধুন্দল ৬০, ঝিঙা ৭০, চিচিঙ্গা ৫০, বেগুন ৮০-১৩০, টমেটো ১৫০, সিম ১২০, ভেন্ডি ৫০, ফুলকপি ৬০, মুলা ৬০ ও পেঁপে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। টমেটো কয়েক দিন আগে কেজিতে ১০০-১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও এখন তার দাম প্রায় ২৫০ টাকা থেকে কমেছে, আর বরবটির দামও ১০০-১২০ টাকা থেকে কমে ৬০-৭০ টাকায় নেমেছে।
তবে অন্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ময়দা ২ কেজি ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা, চিনি ১১০ টাকা, প্যাকেট আটা ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা আর খোলা আটা ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গায়ে দেওয়া সব ধরনের সাবানের দাম ৫-১০ টাকা বেড়েছে, হুইল গুঁড়া ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা কেজি, আর হুইল সাবান ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে। খোলা চালের মধ্যে সর্বনিম্ন গুটি স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে।
ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা কমে ১৪০ টাকা হয়েছে। তবে আদা ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০-২০০ টাকা, রসুন ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকা ও চিকন মসুর ডাল ১৫০-১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর পোলাওয়ের চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০০ টাকার কাছাকাছি দামে।
বাজারে আসা ক্রেতারা বলছেন, বর্তমানে পণ্যের যা মূল্য, তাতে জীবন চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অটোচালক, রিকশাচালক ও শ্রমিকদের জীবন আরও কঠিন। ক্রেতারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন সামনে আরও দাম বাড়বে; যদি বাড়ে, তাহলে মানুষের চলাফেরা আরও কঠিন হয়ে যাবে। তাঁদের ভাষায়, সরকারের উচিত এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।




