‘টেক্সাস বিক্রির জন্য নয়’: সমাবেশে ইলন মাস্ককে নিশানা করে টেক্সাস সিনেট প্রার্থী টালারিকোর হুঁশিয়ারি
টেক্সাসের মার্কিন সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো ধনকুবের ইলন মাস্ককে নিশানা করে বলেছেন, মাস্ক রাজনৈতিক প্রভাব কিনতে চাইছেন। তাঁর ভাষায়, ‘টেক্সাস বিক্রির জন্য নয়।’ শুক্রবার অস্টিনে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এক প্রচার সমাবেশে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই সমাবেশে শত শত শিক্ষার্থী ও সমর্থক অডিটোরিয়াম ভরিয়ে তোলেন। তাঁরা করতালি ও স্লোগানে টালারিকোকে স্বাগত জানান এবং প্রচারের প্ল্যাকার্ড নাড়ান।
প্রেসবিটেরিয়ান সেমিনারিয়ান টালারিকোর প্রতিদ্বন্দ্বী টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই লড়াই আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের সবচেয়ে নজরকাড়া প্রতিযোগিতাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা ১৯৯৪ সালের পর প্রথম রাজ্যব্যাপী জয়ের খোঁজে রয়েছে।
৩৭ বছর বয়সী টালারিকো শুক্রবার তাঁর স্বভাবসুলভ ইতিবাচক বার্তা দিলেও প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণে পিছপা হননি। প্যাক্সটনকে নিজ দলের হাতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিশংসিত হওয়া এবং খুব প্রকাশ্য বিবাহবিচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি তাঁকে রাজ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক বলেছেন।
রাজ্য প্রতিনিধি টালারিকো গাঢ় নীল জ্যাকেট, সাদা খোলা কলারের শার্ট ও নীল জিনস পরে বলেন, ‘আমার একটি আইনসভার রেকর্ড আছে; কেন প্যাক্সটনের একটি অপরাধের রেকর্ড আছে।’ তিনি বলেন, এই নির্বাচন হলো ভোটার এমন সিনেটর চান কি না যিনি ভোটারের পকেটে টাকা দেবেন, নাকি নিজের পকেটে — যিনি টেক্সাসের পক্ষে, নাকি নিজের পক্ষে — যিনি ভোটারের সেবা করেন, নাকি তাঁর বিলিয়নেয়ার মেগা-দাতাদের সেবা করেন।
টালারিকোর অভিযোগ, প্যাক্সটনের পেছনে রয়েছেন সবচেয়ে বড় মেগা-দাতা স্বয়ং মাস্ক। তিনি বলেন, ‘ইলন মাস্ক সিনেটের আসনটি কিনতে চাইছেন। আমরা মাত্র জানতে পেরেছি, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি প্রায় একাই অর্থ জোগাচ্ছেন কেন প্যাক্সটনকে মার্কিন সিনেটে বসানোর এবং আমাদের রাজ্যে আমরা যে আন্দোলন গড়ছি তা থামানোর প্রচেষ্টায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘খুব সম্ভবত, পর্দায় যে আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন দেখেছেন, তা ইলনের। ডাকবাক্সে যে মিথ্যা পেয়েছেন, তা ইলনের। ভয়ংকর সাদা-কালো ছবিসহ যে ভীতিকর বার্তা পেয়েছেন, তাও ইলনেরই।’
বিশাল টেক্সাস রাজ্য পতাকার পেছনে এবং ‘টালারিকো’ সাইন হাতে ৪০ জন তরুণ সমর্থকের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বলেন, তাঁর আন্দোলনের অর্থ আসে ১৩ লাখ ব্যক্তির কাছ থেকে, আর প্যাক্সটনের অর্থ আসে ‘একজন মাত্র লোকের’ কাছ থেকে।
যে রাজ্যে ডেটা সেন্টার একটি উত্তপ্ত ইস্যু হয়ে উঠেছে, সেখানে টালারিকো বলেন, ‘ইলন মাস্ক আমাদের জমি চান। তিনি আমাদের পানি চান। তিনি আমাদের করের টাকা চান। তিনি তাঁর নিজের ব্যক্তিগত মার্কিন সিনেটর চান। তিনি টেক্সাস কিনতে চাইছেন। কিন্তু ৩ নভেম্বর আমরা বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ারকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেব: টেক্সাস বিক্রির জন্য নয়।’
টেক্সাসে বসবাসকারী এবং স্পেসএক্স, টেসলা, এক্সসহ অন্যান্য ব্যবসা সেখানে সরিয়ে নেওয়া মাস্ক সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিয়েছেন, আর সেই ফান্ড একই পরিমাণ অর্থ প্যাক্সটনকে সমর্থনকারী রিপাবলিকান সুপার পিএসি টেক্সাস পিএসিতে স্থানান্তর করেছে — ফেডারেল নথি অনুযায়ী এমনটাই জানা গেছে।
বাইরের অর্থের এই সুবিধার বিপরীতে টালারিকো তৃণমূল তহবিল সংগ্রহ দিয়ে ঘাটতি পুষিয়েছেন। তাঁর প্রচার শিবির বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার তুলেছেন, যা প্যাক্সটনের মোটের তিন গুণেরও বেশি, এবং অনুদানের ৯৭ শতাংশই ছিল ১০০ ডলারের কম।
টালারিকো জনতাকে বলেন, সুপার পিএসি ও ‘বিলিয়নেয়ার মেগা-দাতারা’ মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেট প্রতিযোগিতায় তাঁর তৃণমূল প্রচারকে হারাতে ২০ কোটি ডলার খরচ করছে। তিনি বলেন, ‘বড় টাকা শক্তিশালী, কিন্তু জনশক্তির তুলনায় তা কিছুই নয়’, এবং সমর্থকদের বাইবেলের দাউদ ও গোলিয়াথের গল্পের ‘গুলতি’র সঙ্গে তুলনা করেন।
শুক্রবারের এই সমাবেশ ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র রাজ্যে পরিণত হওয়া টেক্সাসে একটি উত্তাল মাসের সমাপ্তি। সেপ্টেম্বরের শেষে ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে টালারিকো নয় দিন জনসমক্ষে ছিলেন না। এর মধ্যে নানা গুজব ছড়ালেও সেগুলো সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করা হয়।
অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে প্যাক্সটনকে দুবাইতে নববর্ষের আগের রাতে দুই মার্কিন পলাতকের সঙ্গে উদ্যাপন করতে দেখা গেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে ইলিনয়ে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের একজনের কাছ থেকে প্যাক্সটন ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার অনুদান পেয়েছেন, যার মধ্যে অভিযোগ ওঠার পরের ২৫ হাজার ডলারও রয়েছে।
প্রচারে ফিরে টালারিকো রাজ্যজুড়ে সফর শুরু করেন, সিএনএনে সন্দেহপ্রবণ রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র ভোটারদের সঙ্গে টাউন হল করেন। প্যাক্সটন ১৮ দিনের বাস সফর শুরু করেন রক্ষণশীল ভোটারদের লক্ষ্য করে। প্রতিযোগিতার শেষ পর্যায়ে জরিপের গড়ে টালারিকো সামান্য এগিয়ে — ৬ থেকে ১৯ অক্টোবরের জরিপের গড়ে ১ দশমিক ৮ পয়েন্ট, আর বৃহস্পতিবারের এক জরিপে টালারিকো ৪৮ শতাংশ, প্যাক্সটন ৪৬ শতাংশ। ১৯ অক্টোবর থেকে আগাম ভোট শুরু হয়েছে, টালারিকো শুক্রবার আগেই নিজের ভোট দিয়েছেন।
সমাবেশে আসা সমর্থকদের কেউ কেউ প্যাক্সটনের মতো ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের প্রতি হতাশা এবং টালারিকোর বার্তা টেক্সাসে নতুন রাজনৈতিক যুগের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে আশার কথা জানান। ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আলিনা অনিল, যিনি ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন, বলেন দীর্ঘদিন ‘লাল’ থাকার পরও টেক্সাসে তেমন পরিবর্তন আসেনি এবং টালারিকো প্রতিশ্রুতিশীল মনে হয়েছেন, বিশেষ করে তিনি আগে শিক্ষক ছিলেন বলে। ৩১ বছর বয়সী শিশু ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট ডাকোটা ওয়াকার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের প্রশ্নে টালারিকোর ওপর আস্থার কথা বলেন। টেক্সাস ডেমোক্র্যাটদের আশা আগেও ভেঙেছে — ২০১৮ সালে সাবেক কংগ্রেসম্যান বেটো ও’রোর্ক রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের কাছে ৩ পয়েন্টেরও কম ব্যবধানে হেরেছিলেন। এবার ৩ নভেম্বরের ফলই বলবে, টালারিকোর ‘টেক্সাস বিক্রির জন্য নয়’ বার্তা সেই দীর্ঘ খরা কাটাতে পারে কি না।






