ট্রাম্পের নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ওপর নজর রাখতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন হাজারো স্বেচ্ছাসেবী
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে কোনো হস্তক্ষেপ বা অভিবাসন কর্মকর্তাদের (আইসিই) উপস্থিতি নজরে রাখতে হাজার হাজার মানুষ ভোট পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। মার্কিন বিচার বিভাগ প্রায় এক হাজার ফেডারেল পর্যবেক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকেই এই স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে।
অ্যারিজোনার ফিনিক্সের বাসিন্দা স্টিভি লিন গত এক বছর ধরে নিজের এলাকায় যা দেখেছেন, তাতে ক্ষুব্ধ। আইসিই শহরজুড়ে অভিযান শুরু করার পর থেকে পশ্চিম দিকের লাতিনো প্রতিবেশীরা বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন — বাজার করা, কাজে যাওয়া এমনকি ভোট দিতেও ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। সেই কারণেই লিন ভোট পর্যবেক্ষক হতে এগিয়ে এসেছেন।
লিন বলেছেন, ‘ক্ষোভটা আমাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছিল, তাই সেটাকে গঠনমূলক কাজের দিকে ঘোরাতেই হয়েছে।’ অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা তৃণমূল অলাভজনক সংগঠন লুচা (লিভিং ইউনাইটেড ফর চেঞ্জ ইন অ্যারিজোনা) ও অ্যারিজোনা সেন্টার ফর এমপাওয়ারমেন্ট (এস) তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
জুলাইয়ের প্রাইমারিতে লিন তাঁর স্থানীয় ভোটকেন্দ্র থেকে ৭৫ ফুট দূরে — রাজ্যে পর্যবেক্ষকদের জন্য আইনগতভাবে অনুমোদিত দূরত্বে — নিজের গাড়ির পেছনে বসে এলাকা নজরে রাখেন। দশ ঘণ্টায় তিনি মাত্র একটি সমস্যা দেখেছেন: স্থানীয় এক প্রার্থীর প্রচারক বারবার ভোটারদের নিয়ে আইনি সীমা পেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জানালে ভোটকর্মীরা ওই প্রচারককে পেছনে থাকতে বলেন।
তিনবার পর্যবেক্ষক প্রশিক্ষণ নেওয়া লিন প্রাইমারিকে বলছেন ‘মহড়া’। নির্বাচনের দিন তিনি ছুটি নিয়েছেন আবার পর্যবেক্ষণে থাকতে। তাঁর আশা, রিপোর্ট করার মতো তেমন কিছু ঘটবে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমি শুধু চাই ৩ নভেম্বর যেন একঘেয়েমিতে কাটে — সেটাই আমার লক্ষ্য।’
লিনের মতো হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে লুচা ও এসের মতো সংগঠনগুলো প্রশিক্ষণ দিয়েছে ভোটকে নির্বাচনি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করতে। বিচার বিভাগ বলছে, প্রায় এক হাজার ফেডারেল পর্যবেক্ষক পাঠানোর এই উদ্যোগ হবে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচার বিভাগীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রচেষ্টা’, যার উদ্দেশ্য নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন নিশ্চিত করা।
কিন্তু এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মামলা করা সমালোচকরা বলছেন, এতে ভোটাররা ভয় পেতে পারেন। প্রশাসন ভোটকেন্দ্রে আইসিইসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। স্বেচ্ছাসেবী পর্যবেক্ষকরা যেকোনো ভয়ভীতির মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে চান, যদিও অনেকেই আশা করেন নির্বাচনের দিন স্বাভাবিকভাবেই কাটবে।
লোয়োলা ল স্কুলের অধ্যাপক ও সাবেক ওবামা-আমলের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা জাস্টিন লেভিট বলেছেন, ‘এই প্রশাসন সম্পর্কে আমি অসচেতন নই, আমার চোখ পুরোপুরি খোলা। কিন্তু এই প্রশাসন এমন ক্ষমতার প্রদর্শন চায় যা তার নেই, আর ভোটারদের আতঙ্কিত রাখা তাদের স্বার্থেই।’
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকের এক সোমবার রাতে প্রায় ২০ জন অনলাইনে যোগ দেন অ্যারিজোনায় ভোটারদের রক্ষা করা শিখতে। এসের সংগঠক কারিমে রদ্রিগেজ প্রশিক্ষণার্থীদের বোঝান, ‘সাংবিধানিক পর্যবেক্ষক’ ভূমিকাটি কেন তৈরি হলো: এ বছরের শুরুতে অ্যারিজোনাজুড়ে অভিবাসন অভিযান বাড়তে থাকলে রিপাবলিকান রাজ্য আইনপ্রণেতারা ভোটকেন্দ্রে আইসিই এজেন্ট মোতায়েনের বিল তোলেন। তখনই এস দ্বৈত দায়িত্বের জন্য স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শুরু করে।
রদ্রিগেজ প্রশিক্ষণার্থীদের বলেন, ‘এগুলো বিমূর্ত কোনো ভোটকেন্দ্র নয়। এগুলো আমাদের স্কুল, আমাদের গির্জা, আমাদের কমিউনিটি সেন্টার — যেখানে ইতিমধ্যে অভিবাসন অভিযান চলছে।’ মারিকোপা ও পিমা কাউন্টিতে আইসিইর কার্যক্রম ম্যাপ করে এস দেখেছে, অভিযানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোই প্রায়ই ভোটদানে বাধার মুখে থাকা এলাকা। জুলাই প্রাইমারির আগের দুই সপ্তাহে অভিযানের হঠাৎ বৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে তারা; পশ্চিম ফিনিক্সের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রের আশপাশেও আইসিইর কার্যক্রম ছিল।
লুচার মুখপাত্র সেজার ফিয়েরোস বলেছেন, ‘আইসিই আমাদের এলাকায় আছে, আর নাগরিক হলেও মানুষ ভয় পাচ্ছে যে ভোট দিতে গেলে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। আমরা ট্রাকগুলো দেখি, চিহ্নহীন গাড়িগুলো পাশ দিয়ে যেতে দেখি। আমরা ভীত, কারণ কে ওই গাড়িতে আছে তা আমরা কখনো জানি না।’
সংগঠকরা বলছেন, এই তথ্যচিত্রই এখন তাদের নির্বাচন সুরক্ষা প্রচেষ্টার মেরুদণ্ড — কোন কেন্দ্রে পর্যবেক্ষক বসাবেন ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার স্বেচ্ছাসেবী পাঠাবেন, তা ঠিক হয় এর ভিত্তিতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে তিন-চারজন পর্যবেক্ষক শুধু পর্যবেক্ষণ করবেন; সন্দেহজনক কিছু দেখলে নেতৃত্বের কাছে রিপোর্ট করবেন। আইসিই এজেন্ট এলে লুচা ও এসের নেতাদের সতর্ক করা হবে।
এই প্রস্তুতি শুধু অ্যারিজোনায় নয়, সারা দেশে চলছে। পেনসিলভানিয়ায় সেপ্টেম্বরের একই সোমবার রাতে রাজ্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আয়োজিত প্রশিক্ষণে ২৫০ জনের বেশি অংশ নেন। দলের মুখপাত্র জ্যাক ডয়েল বলেছেন, তারা ‘নজিরবিহীন ভোটার সুরক্ষা কর্মসূচি’ গড়ে তুলছেন — অগ্রাধিকার এলাকাগুলোতে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী পর্যবেক্ষক, প্রতিটি কাউন্টিতে স্বেচ্ছাসেবী আইনজীবী এবং ইংরেজি, স্প্যানিশ, ম্যান্ডারিন, ভিয়েতনামি ও কোরিয়ান ভাষায় হটলাইন থাকবে।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) একই রকম ঢল দেখেছে। জুন থেকে ৬৮ হাজার নতুন স্বেচ্ছাসেবী ‘গণতন্ত্র রক্ষী’ হিসেবে নাম লিখিয়েছেন বলে সংগঠনটির জাতীয় গণতন্ত্র প্রচার পরিচালক মলি ম্যাকগ্রা জানিয়েছেন। এসিএলইউ টেক্সাসে ১ হাজার ৭০০, জর্জিয়ায় ৬৫০ এবং অ্যারিজোনার মারিকোপা কাউন্টিতে ১২০ জন ভোট পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে।
তবে ভোটাধিকার বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা নিয়ে সংশয়ী। লেভিটের মতে, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নয় — ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ভোটাধিকার আইন দুর্বল হওয়ার আগে বিচার বিভাগের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ছিল অনেক বড়। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী লরেন মিলার কারালুনাস মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফেডারেল পর্যবেক্ষকদের বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই; তাঁরা রাজ্যের অন্য যেকোনো পর্যবেক্ষকের মতোই একই আইনের অধীন। সব মিলিয়ে, ৩ নভেম্বরের ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোতে এখন দুই পক্ষেরই সতর্ক নজর থাকছে — ফেডারেল পর্যবেক্ষকদের ওপরও নজর রাখবেন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা।






