চীনে গেলে বছরের পর বছর আটকে থাকার ঝুঁকি, আমেরিকানদের সতর্ক করল পররাষ্ট্র দপ্তর
চীন ভ্রমণে যাওয়া আমেরিকানদের জন্য কড়া সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ভুলভাবে আটক, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা (এক্সিট ব্যান) এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ভ্রমণকারী প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ ছাড়াই বছরের পর বছর আটকে থাকতে পারেন।
পররাষ্ট্র দপ্তর এই সপ্তাহে চীনের মূল ভূখণ্ডের জন্য হালনাগাদ করা দ্বিতীয় স্তরের (লেভেল ২) ‘বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন’ পরামর্শ জারি করেছে। ভুল আটক এবং দেশ ছাড়তে বাধা দেওয়ার আশঙ্কাকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরামর্শে ভ্রমণকারীদের সতর্ক করা হয়েছে, পেশাগত, শিক্ষাগত কিংবা ব্যক্তিগত যেসব সাধারণ কাজ পশ্চিমা দেশগুলোতে কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না, চীনের বিস্তৃত নিরাপত্তা আইনের আওতায় সেগুলোই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ব্যক্তিগত যোগাযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে পরামর্শে। আমেরিকানদের বলা হয়েছে, তাদের ইমেইল, বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম চীনা কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকতে পারে। ১৯ অক্টোবরের পরামর্শে বলা হয়েছে, ‘ধরে নিন, চীনের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আপনার ইমেইল, টেক্সট ও সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট পড়তে পারে, সেগুলো চীনে বা চীন থেকে পাঠানো হলে।’
পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, চীনা কর্তৃপক্ষের সমালোচনামূলক বলে বিবেচিত ব্যক্তিগত বার্তার কারণে কেউ কেউ আটক বা বহিষ্কারের শিকার হয়েছেন — এমনকি সেই বার্তা চীনের বাইরে থেকে পাঠানো হলেও।
আটকের ঝুঁকি নিয়ে পরামর্শে আরও বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নির্ধারণ করেছে যে, চীন সরকারের হাতে ভুলভাবে আটক হওয়ার গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছেন আমেরিকানরা।’ দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা পরিবারের সদস্য বা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগের মধ্যে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে পারেন।
আটক না হলেও ভ্রমণকারীদের দেশ ছাড়ায় বাধা আসতে পারে। তদন্ত এবং ব্যবসায়িক বা দেওয়ানি বিরোধের ক্ষেত্রে চীনা কর্তৃপক্ষ ‘এক্সিট ব্যান’ ব্যবহার করেছে। তদন্তের আওতায় থাকা ব্যক্তিদের স্বজন, এমনকি শিশুরাও এ নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছে বলে পরামর্শে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো কোনো ভ্রমণকারী বাড়ি ফেরার জন্য বিমানে ওঠার চেষ্টা না করা পর্যন্ত জানতেই পারেন না যে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষায়, ‘চীন ত্যাগের চেষ্টা করার সময়ই হয়তো কোনো মার্কিন নাগরিক এক্সিট ব্যানের কথা প্রথম জানতে পারেন।’ কোনো কোনো নিষেধাজ্ঞা বছরের পর বছর চলেছে এবং আদালতে সেগুলো চ্যালেঞ্জ করার স্পষ্ট কোনো পথ নেই বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
যারা চীন ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের মার্কিন পাসপোর্ট ও বৈধ চীনা ভিসা নিয়ে ভ্রমণ করতে, স্মার্ট ট্রাভেলার এনরোলমেন্ট প্রোগ্রামে নাম নথিভুক্ত করতে এবং পরিবারের সদস্য বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট ববি লরি ভ্রমণকারীদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘আশপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকুন। ছবি তোলার আগে ভাবুন।’ তার ভাষায়, রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছবি তোলা কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো বিক্ষোভের কাছাকাছি থাকার মতো ঘটনাও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
লরি আরও বলেন, ‘তারপর আপনার ভ্রমণ শেষে আপনি বিমানবন্দরে যান। বোর্ডিং পাস স্ক্যান করেন, বাড়ি ফেরার ফ্লাইটের জন্য ইমিগ্রেশন পার হওয়ার প্রস্তুতি নেন। তখনই বোঝা যায়, আসলে আপনার বাড়ি ফেরার অনুমতি নেই। আপনার ওপর এক্সিট ব্যান আরোপ করা হয়েছে।’
তার পরামর্শ, চীনে যাওয়া যাত্রীরা যেন এমন একটি মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্র সঙ্গে নেন, যাতে শুধু ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসই থাকে। গোপনীয় তথ্য বাড়িতে রেখে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
চীন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। ফলে এই হালনাগাদ সতর্কতা সেখানে বেড়াতে বা কাজে যাওয়ার পরিকল্পনা করা বহু আমেরিকানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে এ বিষয়ে আরও মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি।






