ভোটার পরিচয়পত্র নিয়ে আগিলারের মন্তব্য এখন তাঁর বিরুদ্ধেই অস্ত্র: ক্যালিফোর্নিয়ায় জালিয়াতির মামলার পর চাপে ডেমোক্র্যাট নেতা
যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটদের তৃতীয় শীর্ষ নেতা পিট আগিলার এখন নিজের রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়াতেই ভোটার পরিচয়পত্র নিয়ে করা মন্তব্যের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নির্বাচনের দিনের ব্যালটে থাকা একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন, যেটি পাস হলে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে সরকারি ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক হবে।
আগিলারের ওই মন্তব্যের কয়েক সপ্তাহ পরই মার্কিন বিচার বিভাগ একটি অভিযানের খবর জানায়, যেখানে কয়েকজন মার্কিন স্থায়ী বাসিন্দার বিরুদ্ধে নাগরিক না হয়েও ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। রিপাবলিকানদের দাবি, এই ঘটনাই প্রমাণ করে কেন ব্যালটের ওই প্রস্তাব — প্রপোজিশন ৩৯ — প্রয়োজন ছিল।
রিপাবলিকান প্রতিনিধি কেন ক্যালভার্ট আগিলারের বিরোধিতাকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তিনি বলেন, বিমানে উঠতে, বেতনের চেক ভাঙাতে, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে কিংবা ওষুধের দোকান থেকে ঠান্ডার ওষুধ কিনতেও পরিচয়পত্র দেখাতে হয়; সেখানে ভোট দেওয়ার আগে ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র চাওয়াকে ‘বর্ণবাদ’ বা ‘ভোট দমন’ বলা সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং প্রতিটি ভোটারের বুদ্ধিমত্তার প্রতি অপমান।
আরেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি ভিন্স ফং বলেছেন, ভোটার পরিচয়পত্র হলো মৌলিক নির্বাচনি নিরাপত্তা, যাকে বিপুলসংখ্যক আমেরিকান সমর্থন করেন এবং ইতিমধ্যে ৩৬টি রাজ্যে এ ধরনের নিয়ম চালু আছে। তাঁর ভাষায়, গাড়ি ভাড়া নিতে, হোটেলে থাকতে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে বা বিমানে উঠতে পরিচয়পত্র লাগলে ভোটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য; ক্যালিফোর্নিয়ায় বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক জালিয়াতি-বিরোধী অভিযানই দেখিয়ে দিয়েছে এই সুরক্ষা কেন জরুরি।
প্রতিনিধি ইয়ং কিমও একই সুরে বলেছেন, ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দেখানো একটি সহজ মানদণ্ড, যা বিমানে ওঠা, মদ কেনা বা প্রেসক্রিপশনের ওষুধ তোলার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই মানা হয়। তাঁর মন্তব্য, বিষয়টি বিতর্কিত নয় এবং জটিলও হওয়ার কথা নয়; নির্বাচন অন্তত এক বোতল পানীয়ের সমান যত্ন পাওয়ার যোগ্য।
অন্যদিকে আগিলার চলতি মাসের শুরুতে ডেমোক্র্যাট গভর্নর প্রার্থী ও বাইডেন প্রশাসনের সাবেক মন্ত্রী জাভিয়ের বেসেরার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে প্রপোজিশন ৩৯-এর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ব্যালটে ড্রাইভিং লাইসেন্সের নম্বর লিখতে হলে একটি সংখ্যা ভুল হলেই কি ভোট বাতিল হয়ে যাবে — এমন ঝুঁকি ভোটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় কি না।
আগিলার আরও বলেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় বিয়ের পর নাম না বদলানো ভোটারদের ক্ষেত্রে কী হবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। তাঁর দাবি, এই প্রস্তাব বাস্তবে ভোট দমনের একটি প্রচেষ্টা, যেটি রিপাবলিকানরা এগিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা কেবল তখনই জিততে পারে যখন তারা ভোট দমন করে; ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকদের কাছে নতুন ধারণা বা সমাধান নেই বলেই তাঁরা খেলার নিয়ম বদলাতে চাইছেন।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়া সরকার বিচার বিভাগের ওই অভিযানের সমালোচনা করেছে এবং এমন প্রতিবেদনের দিকে ইঙ্গিত করেছে, যেখানে বলা হয়েছে অভিযুক্তদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে রিপাবলিকান হিসেবে নিবন্ধিতদের সংখ্যাই বেশি। গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের রাজ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রায় এক দশক ধরে ট্রাম্প ভিত্তিহীনভাবে অভিযোগ করে আসছেন যে ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপক ভোট জালিয়াতির চক্র চালিয়েছে এবং ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ ব্যবহার করে নির্বাচন প্রভাবিত করেছে, যেখানে বারবার ক্যালিফোর্নিয়ার দিকেই আঙুল তোলা হয়েছে।
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সব স্তরের আদালত ব্যাপক ভোট জালিয়াতির দাবি কিংবা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। অর্থাৎ ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের অবস্থান হলো, বিচার বিভাগের অভিযানকে একটি রাজ্যের ভোটব্যবস্থা বদলের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
প্রেক্ষাপট হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি রাজ্যে ইতিমধ্যে কোনো না কোনো ধরনের ভোটার পরিচয়পত্র আইন রয়েছে এবং বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমেরিকান এ ধরনের নিয়মকে সমর্থন করেন। তবু কংগ্রেসে ফেডারেল পর্যায়ে ভোটার পরিচয়পত্র আইন পাসের একাধিক উদ্যোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের বাধায় আটকে গেছে।
নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিতর্ক এখন জাতীয় রাজনীতিরও অংশ হয়ে উঠেছে। রিপাবলিকানরা আগিলারের আগের মন্তব্যকে সামনে এনে বলছেন, নিজের রাজ্যে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর তাঁর বিরোধিতা আর টেকে না; ডেমোক্র্যাটরা পাল্টা বলছেন, পরিচয়পত্রের শর্ত বৈধ ভোটারদেরই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
প্রপোজিশন ৩৯ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররাই, নির্বাচনের দিনের ব্যালটে। তার আগ পর্যন্ত আগিলার এই বিতর্কে কী জবাব দেন, সেদিকে নজর থাকবে — তাঁর শিবিরের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত জবাবের কথা জানা যায়নি।





