যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পকে রুখে দিতে তরুণ ভোটারদের বড় পালাবদল

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের জয় অর্ধশতকের মধ্যে যেকোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় বিজয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই জয়ে তরুণ ভোটারদের সমর্থনের পালাবদল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আর পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বিরক্তি—যুক্তরাষ্ট্রের তরুণেরা এসব ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন ব্যালট বাক্সে। গত মঙ্গলবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তরুণদের সমর্থন ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টি ২৫৩ আসনে জয়ী হয়েছে। রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ১৬০ আসন। ৩২ আসনের ফল ঘোষণা বাকি। আর ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ সিনেটে এখন ৫৪টি আসন ডেমোক্র্যাটদের, রিপাবলিকানদের আসন ৪৪টি। সিনেটের দুটি আসনে ফল ঘোষণা বাকি। এবার সিনেটে ভোট হয়েছে ৩৫ আসনে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় এবারের প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচনে ১৮-২৯ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে দুই দলের ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪০ শতাংশ পয়েন্ট ডেমোক্র্যাটদের দিকে গেছে। তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ৩৯ শতাংশ পয়েন্ট, নারীদের ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ পয়েন্ট।
সাক্ষাৎকারে তরুণেরা বলেছেন, বাড়িভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা; চাকরি করে নিজের বাড়ি ও সংসার গড়ার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলনীতি নিয়ে অসন্তোষ তাঁদের সমর্থন পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে।
তরুণদের ভোটের এই পালাবদল শহর ছাড়িয়ে গ্রাম ও শহরতলিতেও ছড়িয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের ৫ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জেতা ২৩৪টি কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের মধ্যে ৫২টিতে এবার ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হয়েছেন। দলটি ২০০৮ সালের পর প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে রয়েছে।
তবে তরুণদের অনেকে স্পষ্ট করেছেন, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তাঁদের সমর্থন নিঃশর্ত নয়। তাঁরা দলকে নয়, পরিবর্তনের আশাকে ভোট দিয়েছেন; বিজয়ীরা প্রতিশ্রুতি রাখছেন কি না, সেটিও তাঁরা দেখবেন।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সী পুরুষদের ভোটের প্রবণতা ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকোর পক্ষে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ পয়েন্ট। এই অঙ্গরাজ্যের রিচমন্ডের ভোটার ট্রিস্টান ওয়ামস্লি (৩৫) বলেন, জেমস তাঁর বয়সী, তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে তিনি নিজেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারতেন এবং জেমস তাঁর মতোই একজন সাধারণ মানুষ। ট্রিস্টান জীবনে এবারই প্রথম অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সব পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন।
ট্রিস্টানের মতো তরুণেরা যে প্রার্থীর মধ্যে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছেন, তাঁদের ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির এমন প্রার্থী ছিলেন মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল-সাইদ, আইওয়ার নবনির্বাচিত গভর্নর রব স্যান্ড, জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ, লস অ্যাঞ্জেলেসের নবনির্বাচিত মেয়র নিত্যা রমন এবং মন্টানা থেকে নবনির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য স্যাম ফরস্ট্যাগ। আর ১৯ বছর বয়সী ড্যানিয়েল ড্যারিস-ও'কনর ম্যাসাচুসেটসের প্রতিনিধি পরিষদে আট মেয়াদ ধরে দায়িত্বে থাকা এক রিপাবলিকানকে হারিয়েছেন।
এভাবে সেকেলে রাজনীতিকদের ভোটাররা বিদায় করেছেন। তাঁরা ফিরিয়ে দিয়েছেন রিক জ্যাকসন ও কেন প্যাক্সটনের মতো ধনী মধ্যবয়সী রিপাবলিকানদেরও। জ্যাকসন জর্জিয়ার গভর্নর পদে প্রার্থী ছিলেন। টেক্সাসে প্যাক্সটন হেরেছেন জেমস ট্যালারিকোর কাছে।
নর্থ ক্যারোলাইনার র্যালিতে ২৩ বছর বয়সী চেজ সার্ডেসন ইলেকট্রিশিয়ানের শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন। তিনি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন। এখন সার্ডেসন ও তাঁর বান্ধবী মাসে ১ হাজার ৮০০ ডলার বাসা ভাড়া দেন। মা-বাবার স্বাস্থ্যবিমার আওতা থেকে বেরিয়ে গেলে কত খরচ হবে, তা হিসাব করে দেখে মন দমে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন সার্ডেসন।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাউথে একটি কফির দোকানের সহকারী ব্যবস্থাপক ২৪ বছর বয়সী ইজি ইমস। তিনি ধর্মপরায়ণ ও রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন এবং হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি এসব প্রভাব থেকে সরে এসেছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। মঙ্গলবার তিনি সব পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন।
টেক্সাসে রিপাবলিকানপন্থী পরিবারে বড় হয়েও এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী ওবেদ আলভিদ্রেজ। তিনি বলেন, এবার তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন সেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা, যাঁরা ধরে নেননি যে তাঁর ভোট এমনিতেই পাবেন। আলভিদ্রেজ পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরিও করছেন। তিনি বলেন, মানুষ আসলে ক্লান্ত।




