ট্রাম্প প্রশাসন ক্যানসার সুরক্ষা দুর্বল করতে ৫০০-র বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে: এনআরডিসির প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দিতে ৫০০-র বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিল (এনআরডিসি)। অক্টোবরে প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে এই অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পদক্ষেপগুলো এমন সময়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন কম বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কিছু ধরন প্রতি দশকে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে ২০ লাখের বেশি মানুষের ক্যানসার শনাক্ত হবে।
কিছু পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আছে অ্যাসবেস্টস নিয়ে নতুন সুরক্ষা কার্যকর করতে বিলম্ব করা এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী কীটনাশক গ্লাইফোসেট বাজারে রাখতে বায়ারের পক্ষ নেওয়া।
কিন্তু প্রতিবেদন বলছে, বেশির ভাগ পরিবর্তন ঘটেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ভেতরের কারিগরি প্রক্রিয়ায়। ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের সংস্পর্শে ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট বদল আনা হয়েছে; যেমন ফরমালডিহাইডের ক্ষেত্রে একসময় সমস্যা হিসেবে ধরা মাত্রা এখন আর কেন্দ্রীয় সরকারের চোখে বিপজ্জনক বলে গণ্য হচ্ছে না।
এনআরডিসির প্রধান লেখক এরিক ওলসন বলেছেন, তিনি ‘সরকারজুড়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে সব সুরক্ষা দুর্বল করার প্রচেষ্টার ব্যাপকতা দেখে বিস্মিত’ হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) নয়; রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কমিশন, পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ আরও অনেক সরকারি সংস্থা এতে জড়িত।
ওলসন বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষের কোনো ধারণাই নেই যে এটি ঘটছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন খুব বেশি হইচই ছাড়াই কাজটি করছে। এই ধাঁধাটা জোড়া লাগানো কঠিন, কিন্তু আমরা তা করেছি এবং এটি এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ইপিএ একটি ‘থ্রেশহোল্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যেখানে ধরে নেওয়া হয় ক্যানসার সৃষ্টিকারীর নির্দিষ্ট মাত্রার সংস্পর্শ নিরাপদ। এই বদলে ফরমালডিহাইডের বিরুদ্ধে সুরক্ষা ইতোমধ্যে দুর্বল হয়েছে। পানির ব্যাপক দূষক হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়ামের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
পারমাণবিক নিয়ন্ত্রকেরা তেজস্ক্রিয় ক্যানসার সৃষ্টিকারীর সংস্পর্শ যুক্তিসংগত সর্বনিম্ন মাত্রায় নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা তুলে দিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে যেকোনো মাত্রার বিকিরণেই ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।
ইপিএর দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা ডেভিড ফতুহি ২০২৬ সালের শুরুতে এক স্মারকে লিখেছিলেন, বিষাক্ত রাসায়নিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি, ক্যানসার সৃষ্টির ক্ষমতাসহ, হিসাব করতে সংস্থাটি অতিরিক্ত রক্ষণশীল ছিল; এসব মান নতুন করে দেখে শিথিল করা উচিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বদলগুলো ১৯৮৫ সাল থেকে ইপিএর ছোট দপ্তর ইন্টিগ্রেটেড রিস্ক ইনফরমেশন সিস্টেমের (আইরিস) করা ৫০০টি ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তি দুর্বল করে। সংস্থাটির সাবেক পানি দপ্তর পরিচালক বেটসি সাউদারল্যান্ড বলেছেন, ঝুঁকি মূল্যায়নের এই পরিবর্তন সবচেয়ে ক্ষতিকর পদক্ষেপগুলোর একটি, কারণ এই সিদ্ধান্তগুলোর ওপর বাতাস, পানি ও ভোগ্যপণ্যে ক্যানসার সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে বিধিমালা দাঁড়িয়ে থাকে। শিশুদের বর্ধিত ঝুঁকি হিসাব করার সুরক্ষা ব্যবস্থাটিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ইপিএ ক্যানসার-সংক্রান্ত বিধি তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি মানব বা প্রাণী গবেষণার বদলে ‘নিউ অ্যাপ্রোচ মেথডলজিস’ নামের স্বল্পমেয়াদি মডেলিং গবেষণা ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে, যেগুলোকে অবিশ্বস্ত ও সহজে কারসাজিযোগ্য বলা হয়েছে। এমন একটি গবেষণা ব্যবহার করে ভোগ্যপণ্যের ব্যাপক ব্যবহৃত রাসায়নিক পি-ডিসিবির ঝুঁকি মূল্যায়ন দুর্বল করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বেনজিন, বিসফেনল এ ও ভিনাইল ক্লোরাইডের মতো ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিকের বিষয়ে শিল্প খাতের তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে; কবে তা হবে, তা স্পষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ক্যানসার সৃষ্টিকারী বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ছাড়ের ব্যবহারও নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে আর্সেনিক ও ইথিলিন অক্সাইডের মতো উপাদানের সংস্পর্শ বাড়বে বলে প্রতিবেদনের দাবি।
পরিস্থিতিটিকে ওলসন তুলনা করেছেন ‘ঘরের ওপর এক বিশাল ডাম্প ট্রাকভর্তি উইপোকা ঢেলে দেওয়ার’ সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কোনো একটি উইপোকাই ঘর ভেঙে ফেলছে না, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত একটি কৌশল—অগণিত উইপোকা সব সুরক্ষার ভিত্তি খেয়ে ফেলছে, আর ঘরটি একসময় ভেঙে পড়বে।’
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউস ও ইপিএর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।



