ডেমোক্র্যাটদের জয়ে প্রথমে ধস, পরে ঘুরে দাঁড়াল বিশ্ববাজার; চাপে টেসলার শেয়ার
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পর বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারে প্রথমে ধস নামলেও পরে শেয়ার ও ডলারের সূচক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাটদের অভাবনীয় জয়ে আইনসভার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরোপের আশঙ্কায় লেনদেনের শুরুতে বড় ধরনের ধাক্কা খায় পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা এআই কোম্পানিতে বিনিয়োগ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকে রাতের লেনদেনে প্রায় ২ শতাংশ পতন দেখা গেলেও ইউরোপীয় কার্যদিবসের সকালে তা কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফেরে। এমএসসিআই অল-ওয়ার্ল্ড ইনডেক্স শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাসেল ২০০০ সূচকের ফিউচার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়, যা আগের সেশনে প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান টেসলা ও স্পেসএক্সের শেয়ারের দর ইউরোপের ট্রেডগেট প্ল্যাটফর্মে প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ পড়ে যায়। তবে অন্যান্য শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে তুলনামূলক কম, প্রায় শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ দরপতন লক্ষ্য করা গেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই খাতকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগের মুখে বৈশ্বিক বাজার চাঙ্গা থাকায় যেকোনো নীতিগত বা আইনি বাধার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় রাজনৈতিক ক্ষমতার এই রূপান্তর নিয়ে ফেডারেটেড হার্মিসের গ্লোবাল লিকুইডিটি মার্কেটসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডেবোরা কানিংহাম বলেন, বছরের শুরুতে খুব কম মানুষই ধারণা করতে পেরেছিলেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা এমন দ্বিমুখী বিজয় অর্জন করবে। তিনি বলেন, এই নীল ঢেউয়ের অর্থ হলো অধিকাংশ নীতিগত বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বিভক্ত হতে যাচ্ছে। এটি সাধারণত নতুন আইন প্রণয়নে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করে, আর এমন পরিবেশকে সার্বিক আর্থিক বাজারগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই ইতিবাচক হিসেবে দেখে, কারণ এতে অনিশ্চয়তার মাত্রা কমে যায়।
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এক্সটিবির গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, সার্বিকভাবে নির্বাচনের এই ফলাফল বাজারে এখন পর্যন্ত বেশ মৃদু প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন নির্বাচনের ফলাফলকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার পর্ব পেরিয়ে নীতির ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়বে তা নিয়ে লেনদেনে মনোযোগ দেবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রুকস বলেন, বুধবারের এই পরিস্থিতি টেসলা ও স্পেসএক্সের জন্য খারাপ খবর হলেও সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো, যা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাণিজ্যের মেরুদণ্ড, তারা এআই নিয়ন্ত্রণের উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হতে পারে এবং মঙ্গলবারের চমৎকার উত্থান ধরে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
আইনসভায় রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে সরকারি ব্যয় সংকোচন হতে পারে এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে আসবে—এমন প্রত্যাশায় বন্ডের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকেছেন অনেক লগ্নিকারী। মার্কিন বেঞ্চমার্ক ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড ৩ বেসিস পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৯২ শতাংশে, যা মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্যে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
টিডি সিকিউরিটিজের জ্যেষ্ঠ রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত নিউনাহা বলেন, বন্ড বাজার এখানে সুস্পষ্ট বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, কারণ আর্থিক বাজারগুলো এআই বাণিজ্যকে তীব্র চাপে ফেলেছে এবং কর কমানোর নতুন পরিকল্পনাগুলো স্থগিত হওয়া ও সরকারি ব্যয় হ্রাসের বাড়তি সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
মুদ্রাবাজারে ডলারের মান কমে যাওয়ায় ইউরোর দর শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ১৩৩ ডলারে এবং ব্রিটিশ পাউন্ড শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৪৮ ডলারে পৌঁছায়। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সুইস ফ্রাঙ্কের বিপরীতে ডলার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং জাপানি ইয়েনের বিপরীতে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ মান হারায়।
অন্যদিকে ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কার দোলাচলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামেও ওঠানামা দেখা গেছে। এদিন ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেলপ্রতি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০৩ দশমিক ১৭ ডলারে লেনদেন হয়।




