‘শর্ত ভেঙে মানুষ মারতে ড্রোন হামলায় ব্যবহার হয়েছে স্টারলিংক’—গতি কমানোর কথা স্বীকার করলেন মাস্ক
ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার গতি কমিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইলন মাস্ক। তাঁর প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের এই পদক্ষেপে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছিল। রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য দেশটি দীর্ঘদিন ধরে এই সেবার ওপর নির্ভর করে আসছে।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্কের এই স্বীকারোক্তির আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট সংযোগের গতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গত সপ্তাহে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সামরিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল।
গত সপ্তাহ থেকে স্টারলিংকের সেবা বিঘ্নিত হওয়ার পেছনে কে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেন বছরের পর বছর ধরে মাস্কের তৈরি এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে, ফলে গতিসীমা আরোপের ঘটনা কিয়েভের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শনিবার এক্সে জেলেনস্কি লেখেন, ‘এখন গতি প্রয়োজনীয় পর্যায়ে রয়েছে।’ তিনি জানান, রাত থেকেই সেবা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয় এবং শনিবার সকালের মধ্যে তা প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। এতে সম্মুখসারিতে রসদ সরবরাহ ও রাশিয়ার জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা কার্যক্রম উন্নত হয়েছে।
ইউক্রেনে সেবা পুনরুদ্ধারের কথা জানানোর পর স্টারলিংকের গতিসীমা আরোপের বিষয়ে মুখ খোলেন মাস্ক। শনিবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি স্বীকার করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার গতি কমিয়ে দিয়েছিল।
মাস্ক লেখেন, ‘বেসামরিক বাণিজ্যিক সেবা স্টারলিংক ব্যবহার করে মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলা চালানোর অনুমতি কখনোই ছিল না, আর থাকা উচিতও নয়। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী স্টারলিংকের ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘন করে মানুষ হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলায় এটি ব্যবহার করেছে। গত সপ্তাহে সেই ফাঁক বন্ধ করা হয়েছে।’
তবে স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ডে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে রয়েছে বলে দাবি করেন মাস্ক। ইউক্রেনের ড্রোন অভিযান ও যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি এই স্টারশিল্ড। একই সঙ্গে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দেশটির প্রতিরক্ষা জোরদারে স্পেসএক্সের ভূমিকার পক্ষেও কথা বলেন তিনি।
গত সপ্তাহে স্টারশিল্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় ইউক্রেনের সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সামরিক কমান্ডাররা জানান, এর ফলে ড্রোন হারিয়ে গেছে এবং বিভিন্ন অভিযান ব্যাহত হয়েছে। সম্মুখসারির কার্যক্রমে এই ব্যাঘাতই পরে সেবা পুনরুদ্ধার নিয়ে তৎপরতা বাড়ায়।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই স্যাটেলাইট সংযোগ নিয়ে এই পরিস্থিতির অবসান হলো। বুধবার রাশিয়া আগামী মাসে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আবার শুরু করতে সম্মত হয়। শুক্রবার ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের রুশ-অধিকৃত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর ওলেশকির আশপাশে স্থানীয় পর্যায়ে যুদ্ধবিরতিতেও সম্মত হয় কিয়েভ ও মস্কো। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি হয়।
এই ঘটনা কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। এর আগে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি নিয়ে মস্কোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত সমঝোতা দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করে। ইউক্রেন ওই সমঝোতাকে নিজেদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছিল।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা সেবা পুনরুদ্ধারের জন্য ‘সরাসরি সংলাপ’ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে জেলেনস্কির কূটনৈতিক তৎপরতার কৃতিত্ব দেন। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর ফলাফল ‘আমাদের সম্মুখসারি, সামরিক বাহিনী, ড্রোনের কার্যক্রম, রসদ সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্য’ কতটা কাজে এসেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, স্টারলিংকের সেবা সীমিত করার সিদ্ধান্ত তিনি নেননি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এ জন্য মাস্ককে দোষারোপ করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হোয়াইট হাউসের সঙ্গে মাস্কের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন। দায়িত্ব কার—এই প্রশ্নে ওয়াশিংটনের ভেতরেই তাই ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছে।
এদিকে ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলের লোজোভা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে শনিবার স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়ার বিভিন্ন শহরে মস্কো-নিযুক্ত কর্তৃপক্ষ শনিবার জানিয়েছে, রাতভর ইউক্রেনের হামলার পর সেখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ শনিবার জানিয়েছে, রাশিয়ার তুলিয়াত্তি শহরের একটি রাসায়নিক কারখানায় হামলা চালিয়েছে তাদের বাহিনী; কারখানাটিতে রকেটের জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ উৎপাদন করা হয়। তুলিয়াত্তির মেয়র ইলিয়া সুখিখ জানিয়েছেন, রাতের হামলায় শহরের শিল্প স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেবা ফিরে এলেও যুদ্ধের ময়দানে হামলা-পাল্টা হামলা থামেনি—এই প্রেক্ষাপটেই স্টারলিংক বিতর্কের পরের অধ্যায় নিয়ে নজর থাকবে সবার।






