ঢাকার কাছে ৩৬০ বছরের পুরোনো পাগলার পুল, হারিয়ে যাচ্ছে মোগল আমলের স্মারক
ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে মোগল আমলের এক ঐতিহাসিক স্থাপনার স্মৃতি। একসময় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এই সেতুর নাম পাগলার পুল, যা সময়ের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলেও এর অবশিষ্ট স্তম্ভ আজও বহন করছে বাংলার অতীত ইতিহাসের নানা কাহিনি।
ইতিহাসের বিবরণ অনুযায়ী, মোগল সুবাদার মীর জুমলা আরাকানি জলদস্যু ও মগদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সোনাকান্দা ও হাজিগঞ্জের মতো জলদুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এসব দুর্গের সঙ্গে তৎকালীন রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ বজায় রাখতে তিনি বিভিন্ন সড়ক ও সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন, পাগলার পুলও সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
জানা যায়, ১৬৬২ সালে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে পাগলা নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঢাকার কাছাকাছি অবস্থিত এই সেতু একসময় যোগাযোগের পাশাপাশি নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
স্থাপত্যের দিক থেকেও পাগলার পুল ছিল ব্যতিক্রমী। সেতুটির চার কোণে ছিল চারটি ফাঁপা টাওয়ার, যার প্রতিটির মাথায় ছিল গম্বুজ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা এসব টাওয়ারে অবস্থান করতেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ফরাসি পর্যটক ও ব্যবসায়ী জ্যাঁ-বাতিস্ত ট্যাভেরনিয়ার ১৬৬৬ সালে এই সেতুর পাশের উঁচু থামে দস্যুদের কাটা মাথা ঝুলতে দেখেছিলেন বলে তাঁর বিবরণে উল্লেখ করেছেন, যা সে সময়ের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে।
আরাকানি ও মগ জলদস্যুদের আক্রমণ ঠেকাতে পরবর্তী সময়ে মোগলরা সেতুটির একটি স্প্যান ভেঙে দিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। অর্থাৎ যোগাযোগের সেতুই একপর্যায়ে প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছিল।
১৮২৪ সালে বিশপ রেজিনাল্ড হেবার পাগলার পুলের স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর লেখায় সেতুটির সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শিল্পী চার্লস ডয়লির আঁকা ছবিতেও ভাঙা পাগলার পুলের চিত্র ধরা পড়েছে।
এসব ঐতিহাসিক বিবরণ ও চিত্র থেকে সেতুটির একসময়ের স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, যদিও মূল কাঠামোর বেশির ভাগই আজ আর টিকে নেই।
অ্যাটকিনসনের বর্ণনায়, পুলের আশপাশে আলো-ছায়ার এক বিশেষ দৃশ্য তৈরি হতো। দূরে ঢাকার ইউরোপীয় অধিবাসীদের সাদা বাড়িগুলিতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে উজ্জ্বল পরিবেশ তৈরি করত, তার সঙ্গে সেতু ও আশপাশের ভূমির ছায়া মিলে সৃষ্টি করত এক আবেগঘন দৃশ্য।
সময়ের প্রবাহে পাগলা নদী আজ মৃতপ্রায় বা বিলুপ্ত। ঐতিহাসিক পুলটিও প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে মিনারের মতো দেখতে কয়েকটি স্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে।
পাগলার পুল বাংলার মোগল আমলের যোগাযোগব্যবস্থা, সামরিক কৌশল ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক নীরব স্মারক। ইতিহাসের এই সাক্ষীকে সংরক্ষণ করে জাতীয় প্রত্নসম্পদ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচিতির উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহাসিক স্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারবে, আর ঢাকার কাছেই টিকে থাকা এই স্মারক হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসপ্রেমী ভ্রমণকারীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।






