প্রথম সেমিস্টারে জিপিএ ২.৬৭ থেকে হার্ভার্ডে: সিলেটে বেড়ে ওঠা আসিফ মোক্তাদিরের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প ও ভর্তির পরামর্শ
সিলেটে বেড়ে ওঠা আসিফ মোক্তাদির উন্নত শিক্ষার স্বপ্নে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সেমিস্টারে তাঁর জিপিএ ছিল মাত্র ২.৬৭। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েও ছিলেন অনিশ্চয়তায়। সেই আসিফ এখন হার্ভার্ডে স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে পড়ছেন।
আজকের পত্রিকার পডকাস্ট ‘সফল যাঁরা, কেমন তাঁরা’য় অতিথি হিসেবে নিজের সংগ্রাম আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক খান। সেই আলাপেই উঠে এসেছে হার্ভার্ডে ভর্তির যোগ্যতা ও প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার পরামর্শ।
আসিফ বলেন, পারিবারিক ভিসায় আমেরিকা যাওয়ার সময় তিনি কল্পনাও করেননি যে হার্ভার্ডে পড়তে পারবেন। দেশে উচ্চমাধ্যমিকের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে তিন সেমিস্টার পড়েছিলেন তিনি। আমেরিকায় গিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়, যার জন্য অনেক মনোবল দরকার হয়।
বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক শেষ করে তিনি ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট স্টাডিজে মাস্টার্স করেন, পরে মেডিকেল সায়েন্সে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। চিকিৎসাকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁর মনে হয়, রোগীদের আরও ভালো সেবা দিতে হলে আরও উচ্চতর ডিগ্রি দরকার। নিজেকে যাচাই করতে তিনি কলাম্বিয়া ও হার্ভার্ডে আবেদন করেন। দুটোতেই সুযোগ পেয়ে তিনি অবাক হয়েছিলেন। অনেক ভেবে তিনি হার্ভার্ড বেছে নেন। এখন তিনি পাবলিক হেলথে প্রথম সেমিস্টারে পড়ছেন।
আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার শুরুর চ্যালেঞ্জগুলোর কথা বলতে গিয়ে আসিফ তিনটি বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমটি পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব: দেশের তিন সেমিস্টারের ক্রেডিট কীভাবে ট্রান্সফার হবে, কোথায় যোগাযোগ করবেন, আমেরিকার ভর্তিপ্রক্রিয়া কী, টিউশন ফি কীভাবে দেবেন—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। দ্বিতীয়টি খরচ। আর অভিবাসীদের বড় সমস্যা ভাষা, কারণ তাঁরা বাংলায় অভ্যস্ত।
খরচের প্রশ্নে তিনি বলেন, তিনি খুবই ভাগ্যবান যে স্নাতকে সরকারি সহায়তা পেয়েছিলেন। তাই নিজের পকেট থেকে খুব বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। মাস্টার্স ও ডক্টরেটের সময় তিনি ঋণ নিয়েছেন, যা ধীরে ধীরে শোধ করবেন। তিনি কফি শপে কাজ শুরু করেন, তবে টিউশন ফি দেওয়ার জন্য নয়, নিজের খরচ আর পরিবারকে কিছুটা সাহায্য করার জন্য। আমেরিকায় এটি খুবই স্বাভাবিক; অধ্যাপকের সন্তানরাও রেস্টুরেন্ট বা রিটেইল স্টোরে কাজ করেন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডভাইজারও কফি শপে কাজ করতেন বলে তিনি জানান।
প্রথম সেমিস্টারের ধাক্কার পেছনে নিজের কিছু ভুলের কথাও অকপটে বলেছেন আসিফ। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিস্টারে ২০-২২ ক্রেডিট নিতেন তিনি। আমেরিকায় সাধারণত ১২, ১৫ বা ১৮ ক্রেডিট নেওয়া হয়, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। জেদ করে অনেক কঠিন কোর্স নিয়েছিলেন তিনি। ভাষার ভয়, নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা আর জীবনযাত্রার ভারসাম্য—সব মিলিয়ে সময়টা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রথম সেমিস্টারের ফল দেখে মনে হয়েছিল পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি না। কিন্তু এত কষ্ট করে এসে সুযোগ হেলায় হারাতে চাননি তিনি। ছোটবেলার স্বপ্ন, মা-বাবার স্বপ্ন—সবই মাথায় ছিল। তিনি নিয়মিত অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, আমেরিকান বন্ধুদের কাছে তাঁদের পড়ার পদ্ধতি জানতে চান, তাঁরা কীভাবে পড়েন তা দেখেন। এভাবে একটি ধারা পেয়ে যান তিনি, তারপর তিনটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড পান।
দেশে তিন সেমিস্টার সম্পন্ন করে সেখান থেকে প্রায় ৩৫ ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে পেরেছিলেন তিনি, তাই চার বছরের জায়গায় তিন বছরে স্নাতক শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় বাসার কাছে ছিল, টিউশন ফিও তুলনামূলক কম ছিল। শুরুতে ক্লাসে ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন তিনি, ভুল হলে শিক্ষক-সহপাঠীরা কী ভাববেন সেই চিন্তায় পেছনে চুপচাপ বসে থাকতেন। পরে বুঝলেন, প্রশ্ন না করলে আর না মিশলে এগোনো যাবে না। তখন ইংরেজি বলার চর্চা শুরু করেন, প্রশ্ন করেন, গ্রুপ স্টাডি করেন। এতে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে পারেন তিনি।
হার্ভার্ড বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে আসিফ বলেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল আইভি লিগে পড়া। কলাম্বিয়ার ফল আগে আসায় তিনি আত্মবিশ্বাস পান। তবে আবেদনের সময়ই ঠিক করেছিলেন, হার্ভার্ডে না হলে আর পড়বেন না। বোস্টন শহর তাঁর পছন্দ, হার্ভার্ডের ব্র্যান্ড ভ্যালু আর বিশ্বজোড়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক আছে। বড় বড় বিজ্ঞানী ও বিখ্যাত ব্যক্তিরা সেমিনার করতে আসেন। আরেকটি বড় কারণ ক্রস-রেজিস্ট্রেশন: পাবলিক হেলথে পড়েও বিজনেস স্কুল, মেডিকেল স্কুল, এমনকি এমআইটিতেও ক্লাস নেওয়া যায়।
ভর্তির যোগ্যতা নিয়ে তাঁর পরামর্শ, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ, স্নাতকের সিজিপিএ, স্টেটমেন্ট অব পারপাস আর রেকমেন্ডেশন লেটার ভালো রাখতে হবে। হার্ভার্ড শুধু জিপিএ দেখে না, দেখতে চায় আবেদনকারী কেন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়তে চান। স্টেটমেন্ট অব পারপাস লেখা যত আগে সম্ভব শুরু করা উচিত, কারণ বারবার সম্পাদনা করতে হয়। ভর্তি পর্যালোচনা কমিটি আবেদনকারীকে চেনে না, এই লেখাই তাঁদের কাছে আবেদনকারীকে পরিচয় করানোর একমাত্র মাধ্যম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অনলাইন টেমপ্লেট নকল করলে চলবে না, কারণ প্রত্যেকের কারণ আলাদা। জীবনের কোন ঘটনা ওই বিষয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছে, সেই গল্প তুলে ধরতে হবে। সিজিপিএ কম থাকলে সংক্ষেপে কারণ উল্লেখ করা যায়। শুধু ‘আমি খুব পরিশ্রমী, মানুষকে সাহায্য করতে চাই’ ধরনের সাধারণ লেখা হলে হবে না; এমনভাবে লিখতে হবে, যেন পর্যালোচনা কমিটি বলেন, এই শিক্ষার্থীকে তাঁরা তাঁদের বিভাগে চান।
রেকমেন্ডেশন লেটারের ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ, যিনি আবেদনকারীকে ভালোভাবে চেনেন, তাঁর কাছ থেকেই চিঠি নেওয়া ভালো। খ্যাতিমান অধ্যাপক আবেদনকারীকে না চিনলে সাধারণ ধরনের চিঠি লিখবেন, এমন হাজার হাজার চিঠি কমিটির কাছে থাকে। যিনি চেনেন, তিনি আবেদনকারীর গবেষণা, দুর্বলতা কীভাবে কাটিয়েছেন, শক্তির জায়গা আর পাঁচ বছর পর তিনি কোথায় থাকতে পারেন, তা সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারবেন। আর অবশ্যই অনেক আগে অনুরোধ করতে হবে, কারণ অধ্যাপকেরা ব্যস্ত থাকেন। সহপাঠ্যক্রমিক কাজের ক্ষেত্রেও তাঁর মত, সবকিছুতে জড়িয়ে সব উল্লেখ করা ভুল; এতে মনে হয় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না। যে বিষয়ে পড়া হবে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ করা উচিত, যেমন অলিম্পিয়াড, বিতর্ক, কোডিং প্রতিযোগিতা বা বই লেখা।
খরচ নিয়ে আসিফ বলেন, হার্ভার্ড অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিভাগ অনুযায়ী নিজস্ব বৃত্তি দেয়, তবু বাকি অঙ্ক বেশ বড় থাকে। ভর্তির পর আর্থিক সহায়তা দপ্তরে যোগাযোগ করলে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের বৃত্তির তালিকা পাঠানো হয়। অনেক বৃত্তির অঙ্ক কম, কিন্তু কয়েকটিতে আবেদন করলে টিউশন অনেক কমে আসে। বাংলাদেশ থেকে আবেদনের ক্ষেত্রে তাঁর ধারণা সীমিত, কারণ তিনি আমেরিকা থেকে আবেদন করেছিলেন। লেখালেখি পছন্দ করেন আসিফ; ২০২২ ও ২০২৩ সালের বইমেলায় তাঁর দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। রেফারেলের পর অনেক রোগী ভাষাগত বা অন্য কারণে ফলোআপ করেন না; তাঁদের সাহায্যে তিনি ‘রেফারেল অ্যাসিস্ট’ নামে একটি অলাভজনক সংগঠন পরিচালনা করেন, যেখানে স্বেচ্ছাসেবকেরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ও মনে করিয়ে দিতে সাহায্য করেন। আরেকটি অলাভজনক সংগঠন ‘অ্যাচিভ’-এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার বাছাইয়ে সেমিনার আয়োজন। সাংবাদিকতাও করেছেন তিনি। তাঁর এই যাত্রা এখন অনেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ: প্রথম ধাক্কাই শেষ কথা নয়, পদ্ধতি বদলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো যায়।





