শ্রেণিকক্ষের ভেতরে-বাইরে প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা চায় এমজেএফ: মাদ্রাসাসহ সব প্রতিষ্ঠানে হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির দাবি
দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নির্যাতন ও হয়রানির সাম্প্রতিক খবরে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। সংস্থাটি বলেছে, শ্রেণিকক্ষের ভেতরে-বাইরে প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো শিশুকেই যেন শিক্ষা ও নিরাপত্তার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে না হয়।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে এমজেএফ জানায়, গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার ও কুষ্টিয়ায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে সংস্থাটির আশঙ্কা, প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে, কারণ ভয়, সামাজিক লজ্জা কিংবা চাপের কারণে অনেক শিশু নির্যাতনের কথা বলতে পারে না।
বিবৃতিতে অভিযোগ জানাতে বাধা দেওয়া এবং ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টিকেও উদ্বেগজনক বলা হয়েছে। এমজেএফের দাবি, প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে, আর সেই প্রক্রিয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সার্বিক কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ও স্নেহপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান এই বিশ্বাস নিয়ে যে সেখানে তারা শিখবে, নিজেদের বিকশিত করবে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়বে। যাঁদের দায়িত্ব শিশুদের যত্ন নেওয়া ও শিক্ষা দেওয়া, তাঁদের কাছ থেকে কোনো শিশুর ভয় পাওয়ার কথা নয়।
শাহীন আনাম আরও বলেন, কোনো শিশু নির্যাতনের কথা জানালে প্রথম দায়িত্ব হলো তার কথা শোনা, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুদের যেকোনো নির্যাতন বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কথা নির্ভয়ে জানাতে বাবা-মাকে তাদের উৎসাহিত করতে হবে; তাদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তাদের কথা শোনা হবে, অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্যাতনের কথা বলার কারণে কোনো শিশুকে দোষারোপ, ভয় দেখানো বা চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে না। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব, আর প্রতিটি শিশু যেন নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা জোরদার করা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য এমজেএফ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশনা এবং পরবর্তী নির্দেশনার আলোকে তারা বারবার মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছে।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার এমজেএফ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে — হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে, কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি সংস্থাটি বলেছে, নির্যাতনের শিকার শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের পরিচয়, গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবিও বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে তোলা হয়েছে।
এমজেএফের মতে, শিশুদের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদ পরিবেশে, মর্যাদার সঙ্গে এবং কোনো ভয় ছাড়াই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে — সেটি নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর তদন্ত কত দ্রুত ও কতটা নিরপেক্ষভাবে হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের দাবি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই আহ্বানের ফল। আপাতত এমজেএফের বিবৃতি শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটিকে আবারও জাতীয় আলোচনার সামনে এনেছে।




