প্রথমবার প্রিলিতে ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়েননি: বেয়ার অ্যাক্টকে সঙ্গী করে বিচারক হওয়ার পথে নূর জাহান
ছোটবেলায় টেলিভিশনে বিচারককে ‘অর্ডার অর্ডার’ বলে বিচার করতে দেখে ভাবতেন, তিনিও যদি এমন বলতে পারতেন! তখন জানতেন না, কীভাবে বিচারক হতে হয়। ধীরে ধীরে সেই স্বপ্ন পরিবারের স্বপ্ন হয়ে ওঠে, আর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী নূর জাহানের কাছে বিচারক হওয়াই হয়ে দাঁড়ায় অঙ্গীকার।
তবে পথটা সহজ ছিল না। ১৭তম বিজেএস ছিল তাঁর প্রথম পরীক্ষা, আর সেবার প্রিলিমিনারিতেই ব্যর্থ হন তিনি। সেই ব্যর্থতাই পরে তাঁর প্রস্তুতির কৌশল বদলে দেয়।
প্রথমবার তিনি বেয়ার অ্যাক্টের চেয়ে আইনপাঠ বেশি পড়তেন। ফলে দেওয়ানি কার্যবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি বুঝতে সমস্যায় পড়েন। ব্যর্থতার পর সংবিধান ও পারিবারিক আইন ছাড়া বাকি সব বিষয়ে বেয়ার অ্যাক্টকেই করেন মূল ভিত্তি। ১৮তম বিজেএস ছিল তাঁর দ্বিতীয় পরীক্ষা।
১৮তম বিজেএসের বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা না করে তিনি আগেভাগেই পরিকল্পনা সাজান। প্রতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে সব বিষয় শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করেন, আর বাকি পাঁচ দিন রাখেন অসম্পূর্ণ অংশ শেষ করার জন্য। বিজ্ঞপ্তি আসার আগেই হাতে সময় থাকায় এই ছক তাঁকে এগিয়ে রাখে।
সংবিধানের জন্য তিনি পড়তেন মূল সংবিধান, আব্দুল হালিমের বই ও ‘সহজ ভাবনায় সংবিধান’। প্রয়োজনমতো দেখতেন জসীম আলী চৌধুরী ও মাহমুদুল ইসলামের বই। মুসলিম আইনে ফয়েজ উদ্দিন ও ডি এফ মুল্লা, হিন্দু আইনে আজিজুল হক এবং উত্তরাধিকার আইনে ইকরাম স্যারের বই অনুসরণ করতেন। বুঝতে অসুবিধা হলে নিতেন আইনপাঠের সহায়তা।
প্রিলির আগে তিনি অংশ নিতেন Live MCQ-এর পরীক্ষায় এবং সিভিল জজ রাগীব মোস্তফা নাইম ও সাদিকুর রহমান রোমানের আয়োজিত পরীক্ষায়। সেখানে ভালো নম্বর তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াত। কোথাও ক্লাস করেননি তিনি, শুধু পরীক্ষা দিয়েছেন। সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি সাহিত্য ও বিজ্ঞানে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আয়েশা সিদ্দিকা ইমার বই ও ‘রিটেন মাস্টার’ পড়ে প্রশ্নের ধরন এবং প্রশ্ন আসার জায়গা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান নূর। এরপর সেভাবেই নিজের প্রস্তুতি সাজান।
আলাদা নোট করার অভ্যাস ছিল না তাঁর। তাই বেয়ার অ্যাক্টে ধারার পাশে ছোট ছোট পয়েন্ট লিখে রাখতেন। প্রাসঙ্গিক মামলা পেলে তা-ও লিখতেন সংশ্লিষ্ট ধারার পাশে। প্রিলির বইগুলোই পড়েছেন, শুধু বাদ দিয়েছেন আইনপাঠ। প্রিলির সময় আইনগুলো হালকাভাবে পড়লেও লিখিতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো ভালোভাবে আয়ত্তে আনেন। দিনভর পড়তেন আইন, রাতে সাধারণ বিষয়।
প্রথমবার লিখিত দিয়েই তাঁর বিশ্বাস ছিল, সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার মতো পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে লিখিতের পর ভাইভার প্রস্তুতিতে মন বসত না। তবু সব আইনের বেয়ার অ্যাক্ট আরেকবার দেখেছেন তিনি।
ভাইভার প্রস্তুতিতেও তাঁর নিজস্ব কৌশল ছিল। ‘ভাইভা বুস্টার’ বইটি প্রি-অর্ডার করেন, হাতে পান ভাইভার কয়েক দিন আগে। প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা পড়ার সময় নিজেকে তাঁদের জায়গায় কল্পনা করতেন, যেন সত্যিই বোর্ডে বসে উত্তর দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকালে বিজেএস কমিশনের ওয়েবসাইটে সদস্যদের ছবি দেখতেন, যাতে বোর্ডের সামনে পড়লে মুখগুলো পরিচিত লাগে; মুখস্থ করেছিলেন তাঁদের নামও।
তাঁর এই পথচলার পেছনে ছিল পরিবারের স্বপ্নও। বাবা-মা ও ভাই-বোনের স্বপ্নপূরণে বিচারক হওয়াই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর অঙ্গীকার, আর ছোটবেলার সেই ‘অর্ডার অর্ডার’ বলার কল্পনা ধীরে ধীরে বাস্তবের কাছাকাছি আসে।
নূর জাহানের অভিজ্ঞতা নতুন পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় — ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়; প্রস্তুতির ভুল চিহ্নিত করে কৌশল বদলানো, মূল আইনের বইকে ভিত্তি করা এবং নিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে যাচাই করাই তাঁর সাফল্যের সূত্র।






