ঝিনাইদহে পরকীয়ার অভিযোগে নারীকে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ, আইনে শাস্তির বিধান কার জন্য
ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক নারীকে মারধর করা, তাঁর চুল কেটে দেওয়া এবং শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কয়েকজন ব্যক্তি নিজেরাই এই নির্যাতন চালিয়েছেন বলে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে।
আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের বিবরণ অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর বিকেলে করোতিপাড়া গ্রামের ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে প্রথমে তাঁকে সতর্ক করেন পাশের গ্রাম নসায়নপুরের রশিদ। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করতেই আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হন।
এরপর তাঁকে মারধর করা হয়, চুল কেটে দেওয়া হয় এবং শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। মাকে রক্ষা করতে গেলে তাঁর ছেলেও লাঠির আঘাত পান।
যাঁর সঙ্গে পরকীয়ার অভিযোগ উঠেছে, আনোয়ার নামের সেই ব্যক্তির স্ত্রী নিজ হাতে ওই নারীর চুল কেটে দিয়েছেন বলে খবরে বলা হয়েছে।
এই ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: কারও বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠলে তার বিচার করার দায়িত্ব ব্যক্তির, নাকি রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার? অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং অপরাধের বিচারের জন্য রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী পরকীয়া বা ব্যভিচারের শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড। তবে এই আইনে কেবল অন্য পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষের শাস্তির বিধান রয়েছে। এতে নারীর কোনো শাস্তির বা অপরাধী হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান নেই বলে আইনের এই ধারার বর্ণনায় বলা হয়েছে।
অর্থাৎ আইনের চোখে এই অভিযোগে শাস্তি হওয়ার কথা থাকলে তা-ও নির্ধারিত হতো আদালতের বিচারে, কোনো ব্যক্তির হাতে নয়। ব্যক্তিগত সন্দেহ কিংবা সামাজিক অপবাদ কাউকে অন্যের বাড়িতে প্রবেশ, শারীরিক নির্যাতন বা অপমান করার অধিকার দেয় না।
কোনো নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত। অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়ার নামে চুল কেটে দেওয়া কিংবা শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানো কোনো সামাজিক বিচার নয়, এটি নির্যাতন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সবাই যদি নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তাহলে সমাজকাঠামো ভেঙে পড়তে বাধ্য। যাঁরা আইন ভাঙেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ ধরনের আচরণ ঘটতেই থাকবে বলেও মত উঠেছে।
নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের একাংশের অতিরিক্ত কৌতূহল এবং নৈতিকতার নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে সমাজ যতটা কঠোর, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ততটা দায়িত্বশীল কি না, সেই প্রশ্নও এই ঘটনা সামনে এনেছে।
ঝিনাইদহের এই ঘটনায় অভিযোগের বিচার আইনের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান উঠেছে। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, তা নির্ধারণের আগেই নিজেদের বিচারক ও শাস্তিদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এই আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেই আলোচনায় বলা হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, এই নির্যাতনের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর আহত ছেলের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয় কি না।




