মধ্যবর্তী নির্বাচনে পেছনে পড়লেও এপস্টেইন ইস্যু হারিয়ে যাচ্ছে না, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেফরি এপস্টেইন কেলেঙ্কারি পেছনে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীদের পক্ষের কয়েকজন আইনজীবী ও অধিকারকর্মী। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইস্যুটি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে না; কংগ্রেস অধিবেশনে ফিরলেই এটি আবার সামনে আসতে পারে।
প্রয়াত অর্থলগ্নিকারী ও অভিযুক্ত যৌন পাচারকারী এপস্টেইনের সামাজিক বলয় ছিল আমেরিকার প্রভাবশালী মহলের বিস্তৃত অংশজুড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ভোটার একই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্ন—জীবনযাত্রার ব্যয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব—এবং এই কেলেঙ্কারি, দুটো বিষয়েই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন।
একাধিক এপস্টেইন-ভুক্তভোগীর প্রতিনিধিত্ব করা গোল্ডল আইন প্রতিষ্ঠানের স্পেন্সার কুভিন বলেছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জনগণ ভুলে যাবে কি না তা নয়; উদ্বেগ হলো জবাবদিহির দায় যাদের, সেই রাজনীতিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের অস্থিরতাকে অজুহাত করে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাবে কি না।
কুভিনের ভাষায়, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিতর্ক শিরোনাম দখল করতে পারে, কিন্তু তা ভুক্তভোগীদের কষ্ট মুছে দেয় না, কিংবা এপস্টেইন ও তাঁর ক্ষমতাবান সহযোগীরা কীভাবে দশকের পর দশক ধরে কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন—সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোও মুছে দেয় না। তাঁর মন্তব্য, ন্যায়বিচারের কোনো মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ থাকা উচিত নয় এবং তা খবরের চক্র দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।
মার্কিন সরকারের কাছে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অনেকের মতে, আগের প্রকাশগুলো ছিল অসম্পূর্ণ এবং কিছু নথি বাদ দেওয়া হয়েছিল। কংগ্রেসের কাছেও জবাবদিহি দাবি করার আহ্বান জানিয়েছেন কুভিন।
কিশোরী মেয়েদের যৌন নির্যাতন ঘিরে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অসংখ্য ভুক্তভোগীর মামলায় প্রতিনিধিত্ব করা মার্শ ল-এর জেনিফার ফ্রিম্যান বলেছেন, গত এক বছরে এপস্টেইনের দিক থেকে মনোযোগ সরে যাওয়া হতাশাজনক। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভুক্তভোগীদের ন্যায় পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদী; তাঁর বিশ্বাস, নির্বাচনী চক্রের কারণে মনোযোগ সরে গেলেও বিষয়টি শিগগিরই আবার মনোযোগ ও জবাবদিহির কেন্দ্রে ফিরবে।
ফ্রিম্যান জানিয়েছেন, এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দশকের পর দশক ধরে বারবার ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে অবহেলার মামলা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি সংগ্রহ ও তৈরির অভিযোগে এপস্টেইনের এস্টেটের বিরুদ্ধে একটি শ্রেণি-মামলাও (ক্লাস অ্যাকশন) লড়ছেন তিনি।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও প্রিন্সিপলস ফার্স্টের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ব্রিটানি মার্টিনেজ বলেছেন, চারদিকে এত ঘটনা ঘটছে যে সবকিছুই যেন উত্তপ্ত। মানুষ একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভাবতে পারে, কিন্তু যা সরাসরি তাদের জীবনে প্রভাব ফেলে—জ্বালানির দাম, জীবনযাত্রার খরচ ও সরকার ঠিকমতো কাজ করছে কি না—সেগুলোই আগে আসে, আর তাতে এপস্টেইন ইস্যু তাৎক্ষণিক আলোচনা থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। তবে তাঁর মতে, প্রশ্নগুলো বা উত্তরের দাবি হারিয়ে যায়নি; সেগুলো শুধু মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ক্লিনিক্যাল সহযোগী অধ্যাপক শন ডোনাহিউ সময়ের দিকটির ওপর জোর দিয়েছেন। কংগ্রেস বর্তমানে অবকাশে থাকায় প্রতিনিধি পরিষদের ফ্লোরে এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের প্রস্তাবিত নতুন সংস্করণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। প্রস্তাবিত এই দ্বিতীয় আইনটির লক্ষ্য বর্তমান আইনের ঘাটতিগুলো—যেমন কার্যকর করার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি—দূর করা, এমনটাই বলছেন অধিকারকর্মীরা।
ডোনাহিউর ধারণা, জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে জিতলে তারা এপস্টেইন ইস্যুতে রিপাবলিকানদের চাপে ফেলবে এবং প্রথম দিন থেকেই তদন্ত শুরু করতে প্রস্তুত থাকবে। তাঁর মতে, কংগ্রেস অধিবেশনে ফিরলেই বিষয়টি আবার বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটরা এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে।
অলাভজনক সংগঠন লিফট আওয়ার ভয়েসেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলি রগিনস্কি বলেছেন, ভোটারদের কাছে এপস্টেইনের গুরুত্ব কমেনি। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নামার পেছনের একটি কারণ এই ইস্যু, এবং এখানেই এমনকি ‘মাগা’ রিপাবলিকানরাও তাঁর সঙ্গে মতভেদ করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে আগামী বছর থেকে ভুক্তভোগী ও এপস্টেইন নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হবে বলে তিনি মনে করেন।
নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি তেরেসা লেগার ফার্নান্দেস এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিষয়টি একটি মুহূর্তের চেয়ে বড়—এটি একটি হিসাব-নিকাশের প্রশ্ন, এবং ক্ষমতা, নির্যাতন ও কারা সুরক্ষা পায়, তা নিয়ে কথা বলতে আমেরিকানরা প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, আমেরিকানরা পকেটের হিসাব—মুদি, জ্বালানি ও ভাড়া—দিয়েই ভোট দেবে ঠিকই, কিন্তু তারা ভুলবে না যে এই প্রেসিডেন্ট এপস্টেইনের বন্ধু ছিলেন এবং সত্য লুকানোর চেষ্টা করেছেন।
ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আয়ানা প্রেসলি বলেছেন, এপস্টেইনের নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের ন্যায়ের প্রশ্ন ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েই আছে, কারণ বিবেকবান মানুষ ট্রাম্প প্রশাসনের ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বুঝতে পারছে এবং জবাবদিহি চাইছে। প্রেসলি, লেগার ফার্নান্দেস ও প্রতিনিধি ডেবোরা রস সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের আর্থিক বোঝা কমাতে আইন প্রস্তাবও এনেছেন।
নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট সিনেটর বেন রে লুহান বলেছেন, বিচার বিভাগ (ডিওজে) আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব তদন্ত নথি প্রকাশ করেছে বলে দাবি করলেও তিনি পুরো এপস্টেইন নথি প্রকাশের দাবি চালিয়ে যাবেন। এখন সবার নজর কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তনের দিকে—অধিবেশন শুরু হলেই এই বিতর্ক আবার কতটা জোর পায়, সেটাই দেখার বিষয়।






