মার্কিন যুদ্ধজাহাজ কাছাকাছি এলে গুলি চালানোর হুঁশিয়ারি ইরানের, নতুন হামলার ভাবনায় ট্রাম্প
ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে গুলি চালাতে প্রস্তুত। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন হামলা চালাবে নাকি চাপ অব্যাহত রাখবে, তা নিয়ে এখনো ভাবনাচিন্তা চলছে। তেহরানে কর্মকর্তা, গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের ধারণা — যুদ্ধ আরও কাছে এসেছে, তবে তারা পিছু হটবেন না বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
ট্রাম্প শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে সমর্থকদের বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘আবারও এপিক ফিউরি করতে পারে’ — যুদ্ধের শুরুতে ইরানে ব্যাপক বোমা হামলার অভিযানের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইরানের ওপর বিশাল হামলা চালিয়ে দ্রুত সংঘাত শেষ করা হবে, নাকি নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপ বজায় রাখা হবে।
তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল স্টাফ আলি আবদুল্লাহি জোর দিয়ে বলেন, এই অঞ্চলের যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা ইরানের থাকায় মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা বা তার আশপাশে পুনরায় প্রবেশ করতে সক্ষম নয়।
শনিবার সকালে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুধু স্বপ্নই দেখতে পারেন যে তাদের সৈন্য ও সামরিক বাহিনী আবার পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করবে। এই ইচ্ছা তারা কবর পর্যন্ত নিয়ে যাবেন।’
আবদুল্লাহি আরও বলেন, যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন বক্তব্যে একটি মৌলিক বৈপরীত্য রয়েছে: যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মার্কিন দাবি নিজেই অর্থহীন হয়ে যায় এই কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বিমানবাহী রণতরী ও সহায়ক জাহাজগুলো ইরানি ভূখণ্ডের কাছাকাছি আনতে অস্বীকার করছে।
তিনি আরও বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালিয়ে আট মাসের যুদ্ধ শুরু করে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একটি ‘চোরাবালিতে ডোবাতে’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
হরমুজ প্রণালি ও তার আশপাশে জাহাজগুলো ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধ পুনরায় শুরুর আশঙ্কা বাড়ায় তেলের দাম বেড়েছে — ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ, ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ ডলারে পৌঁছেছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতভর সাতটি ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে বা মাইনে আঘাত করেছে। শুক্রবার তারা দাবি করে, দুটি সুপারট্যাংকার মাইনে আঘাত পেয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, তাদের সামরিক মতবাদ এখন আরও আক্রমণাত্মক, আর ওয়াশিংটন সৌদি আরব থেকে অনেক কূটনৈতিক কর্মীকে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে; অন্যান্য দেশ থেকেও আরও অনেকে চলে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ইয়েমেনে ইরান-মিত্র হুথিরাও সৌদি আরবের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে — শনিবার তারা আবার রিয়াদে হামলা চালিয়েছে; সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দাম্মামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্রও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সৌদি বাহিনী হুথি নিয়ন্ত্রণাধীন মারিব, তাইজসহ ইয়েমেনের কয়েকটি প্রদেশে বোমা হামলা চালিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে শুক্রবার নাবাতিয়ের আশপাশে আরও ইসরায়েলি বিমান হামলা ও জাওতার আশ-শারকিয়ার কাছে কামানের গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ইরান এই ফ্রন্টটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তার যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেছে — অতীতে তারা দাবি করেছিল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে হবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু — যিনি ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের মুখোমুখি, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক দিন আগে — হেবরনে এক ফিলিস্তিনি হামলায় দুই সৈন্য নিহত হওয়ার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে লকডাউনের নির্দেশ দিয়েছেন। গাজা ও পশ্চিম তীরের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে হুথিরাও ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে — যা দেখিয়ে দিচ্ছে, বিস্তৃত আঞ্চলিক শান্তি এখন লেবানন, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজাসহ একাধিক রণাঙ্গনের ঘটনার ওপর নির্ভর করছে।
নেতানিয়াহু ইরানি সরকারকে উৎখাত করার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষক দাবি করছেন, তেহরান একটি ‘ডেড হ্যান্ড’ মতবাদ সক্রিয় করেছে — যার অধীনে, যুদ্ধের শুরুতে যেমন ঘটেছিল, শীর্ষ ইরানি নেতাদের আবারও হত্যা করা হলেও দেশের ৩১টি প্রদেশ থেকে মার্কিন, ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক স্বার্থের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চলতে পারবে।
আইআরজিসি হুমকি দিয়েছে, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু হলে সাগরতলের ইন্টারনেট ও যোগাযোগ কেবলেও হামলা হবে। মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস শনিবার মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানোর ইরানি প্রচেষ্টা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে’।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতামূলক আলোচনা ফলাফলের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। তবে আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো শুক্রবার ইস্তাম্বুলে সমন্বয় বৈঠক করে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের প্রত্যাশা ঘোষণা করেছে।
তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিশরের শীর্ষ কূটনীতিকেরা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির সঙ্গে বৈঠক করেন — যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান কেউই এতে অংশ নেয়নি। বৈঠকের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা একমত যে ইরানের ওপর নতুন হামলা যুদ্ধকে বিস্তৃত করবে এবং সংঘাতকে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেবে। ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই সমাধান নয়। এই মুহূর্তে কেউই তা সমর্থন করছে না।’
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল বলেন, তার সরকার মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার জন্য ইরান ও হুথিদের দায়ী করে। তবে চার আঞ্চলিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসরায়েলি দখলদারিত্বই এই অঞ্চল ও তার বাইরে অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস।’
মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের মীমাংসার ধারায় চার আঞ্চলিক দেশ জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানকে সমর্থন জানায় এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ চলাচলের দাবি তোলে। গোষ্ঠীটি বেসামরিক নাগরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার বিরোধিতা করে এবং সৌদি আরব ও এর লোহিত সাগর জাহাজ চলাচলের স্বার্থের ওপর হুথি হামলার নিন্দা জানায়।
ইস্তাম্বুল বৈঠক আবারও ‘কূটনৈতিক দাবি ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে ফারাক’ প্রদর্শন করেছে বলে শনিবার এক বিশ্লেষণে যুক্তি দিয়েছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম নুর নিউজ। তাদের মতে, ছাড় প্রথমে দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোকেই — ইরানকে নয়। গণমাধ্যমটি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াকে শর্তসাপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে — যুক্তরাষ্ট্রের তেহরানের দাবি মেনে নেওয়া এবং ইরান ও ইয়েমেনে হামলার দায় স্বীকারের ওপর তা নির্ভরশীল।
শনিবার ইরানের বেশির ভাগ সংবাদপত্রের মনোযোগ ছিল যুদ্ধের লক্ষণের ওপর, যার মধ্যে তেলের দাম বৃদ্ধিও রয়েছে। কট্টরপন্থী ভাতান-এ এমরুজের শিরোনামে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া ‘ট্রাম্পের জন্য অপমানের প্রমাণ’। সংস্কারপন্থী এতেমাদ বলেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যুদ্ধের আরেকটি তীব্র পর্বের ‘শূন্য ঘণ্টা’ ঘনিয়ে আসছে।
তেহরানভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক রেজা নাসরি — যার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে — বলেন, কয়েক দশক ধরে হামলা, পারমাণবিক নাশকতা, নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গ করা চুক্তির শিকার হওয়ার পর ইরানের কৌশল এখন ‘যথেষ্ট হয়েছে’। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘ইরান তার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। বোমা হামলার মধ্যে আর আলোচনা করবে না, অন্য পক্ষ ঐচ্ছিক মনে করে এমন চুক্তি মানবে না, কিংবা তার শিশুদের হত্যা ও জনগণের দুর্দশাকে নীতির রুটিন হাতিয়ার হিসেবে মেনে নেবে না। এই চক্রের অবসান ঘটাবে, আর তা করবে সব প্রয়োজনীয় উপায়েই।’






