চট্টগ্রামে এক মাস ধরে মিলছে না থাইরয়েড ক্যান্সারের জীবনরক্ষাকারী ক্যাপসুল: অপারেশনের পর থেরাপি থমকে, ঝুঁকিতে রোগীরা
থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের অপারেশনের পর খেতে হয় ‘রেডিওআয়োডিন’ নামের একটি বিশেষ ক্যাপসুল। কিন্তু সরকারিভাবে সরবরাহ করা একমাত্র এই ক্যাপসুলটি গত এক মাস ধরে চট্টগ্রামে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অপারেশন করা রোগীরা সময়মতো এই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধটির সংকটে বিপাকে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। চিকিৎসকদের মতে, অপারেশনের পর এই থেরাপি দিতে দেরি হলে ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এর আগেও গত বছরের জানুয়ারি মাসে ক্যাপসুলটির সংকট দেখা দিয়েছিল; পরে ওই বছরের আগস্ট মাসে ওষুধ এসেছিল।
থাইরয়েড ক্যান্সারের রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুলটি পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালনাধীন একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সাইন্সেস’ থেকেই সরবরাহ করা হয়। বেসরকারিভাবে এটি বিপণনের কোনো অনুমোদন নেই। ক্যাপসুলটি দক্ষিণ আফ্রিকা ও পোল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে।
চট্টগ্রামের এই ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৪ জন থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেন। বর্তমান সংকটে থাইরয়েড ক্যান্সারের অপারেশনকৃত রোগীদের ওষুধের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে; কবে এই অপেক্ষা শেষ হবে, তা তারা জানেন না।
থাইরয়েড হলো একটি গ্রন্থি, যা ঘাড়ের অংশের গোড়ায়, থাইরয়েড কার্টিলেজের নিচে থাকে—যা অ্যাডামস আপেল নামেও পরিচিত। এই গ্রন্থির কোষে ক্যান্সার হলে অপারেশনের মাধ্যমে তা অপসারণের পর রেডিওআয়োডিন থেরাপি দিয়ে শরীরে থেকে যাওয়া ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়।
ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সাইন্সেসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. পবিত্র কুমার ভট্টচার্য্য বলেন, গত কিছুদিন ধরে ক্যাপসুলটির সংকট চলছে। ইতোমধ্যে ক্যাপসুলটির জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁর আশা, শিগগিরই ক্যাপসুলটি পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ থাইরয়েড ক্যান্সার রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। চ্যালেঞ্জটা হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করতে পারা—এই মন্তব্যে বোঝা যায়, সময়মতো চিকিৎসা এই রোগে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগে থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী শনাক্ত হলেই রোগের অবস্থা অনুযায়ী অপারেশন দেওয়া হয়। এরপর রোগের ধরন অনুযায়ী দেওয়া হয় রেডিওআয়োডিন থেরাপি। চমেক হাসপাতালের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ১২ নম্বর কেবিনটি এই রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকে; সেখানে ভর্তি হয়ে চার-পাঁচ দিন অবস্থান করে এই থেরাপি দেওয়া হয়।
চমেক হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড নেক সার্জারি বিভাগের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করে বলেন, থাইরয়েড ক্যান্সার শনাক্তের পর প্রয়োজন হলে অপারেশন করা হয় এবং প্রতি মাসে গড়ে চার থেকে ছয়টি থাইরয়েড ক্যান্সারের অপারেশন হয়। অপারেশনের পর রোগটি শরীরে না ছড়াতে ক্যাপসুল দিয়ে থেরাপি দেওয়া হয়। সময়মতো থেরাপি না দিলে এটি শরীরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই রোগীর সুস্থতার জন্য ফলোআপ চিকিৎসা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ঘাড় বা গলার সামনের দিকে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির থাইরয়েড গ্রন্থিতে হরমোনের ঘাটতি বা আধিক্যের কারণে ক্যান্সার হতে পারে, যার জন্য অপারেশন অপরিহার্য। অপারেশনের পর আয়োডিন-১৩১ নামক তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে রেডিওআয়োডিন থেরাপি দেওয়া হয়, যা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে। থাইরয়েড গ্রন্থি অপারেশনের পর এই থেরাপি নিতে দেরি হলে রোগীর শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড ক্যান্সার চার প্রকার—প্যাপিলারি, ফলিকুলার, মেডুলারি ও অ্যানাপ্লাস্টিক।
একমাত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আমদানি প্রক্রিয়া শুরু হলেও ক্যাপসুলটি হাতে পেতে আরও কত দিন লাগবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তত দিন অপারেশন শেষে থেরাপির অপেক্ষায় থাকা রোগীদের অনিশ্চয়তাই সঙ্গী।



