প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করল আইপ্যাক: ইসরায়েল প্রশ্নে বদলে যাওয়া আমেরিকার রাজনীতির ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবি সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) ঘোষণা দিয়েছে, তারা আর কোনো প্রার্থীকে সরাসরি সমর্থন দেবে না এবং সরাসরি অনুদানও দেবে না। বুধবারের এই ঘোষণাকে সংগঠনটির সমালোচকরা দ্রুতই আইপ্যাকের স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখছেন—তাদের ভাষায়, সংগঠনটির নাম এখন এতটাই বিতর্কিত হয়ে উঠেছে যে প্রকাশ্য সমর্থন প্রার্থীদের জন্য সুবিধার বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই সিদ্ধান্ত একটি বড় উল্টোপথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গাজায় সর্বশেষ যুদ্ধের পর ইসরায়েল সম্পর্কে মার্কিন জনমত কতটা গভীরভাবে বদলে গেছে এবং প্রার্থীদের একসময়ের স্বতঃস্ফূর্ত ইসরায়েল-সমর্থন কীভাবে রাজনৈতিক দায়ে পরিণত হয়েছে, এই ঘোষণা তা-ই তুলে ধরছে।
তবে আইপ্যাক মার্কিন নির্বাচন থেকে সরে যাচ্ছে না। মাত্র তিনটি নির্বাচন চক্র আগে নিজস্ব পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি চালু করে প্রার্থীদের সমর্থন দিতে শুরু করেছিল সংগঠনটি। এবার তারা জানিয়েছে, তাদের অর্থশালী সুপার প্যাক ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’-এর কাজ চলবে এবং ব্যক্তিগত দাতা ও সদস্যদের মাধ্যমে ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীদের পেছনে লাখো ডলার খরচও অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ কৌশল বদলাচ্ছে, মাঠ ছাড়ছে না সংগঠনটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি লিখেছেন, ঐতিহাসিকভাবে আইপ্যাকের ছিল এক অপরাজেয় ভাবমূর্তি—সেই ভাবমূর্তির কারণেই প্রতিপক্ষ অনেক লড়াইয়ে নামারই সাহস পেত না। তাঁর ভাষায়, অপরাজেয়তার বদলে এখন আইপ্যাকের নাম এতটাই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে যে সংগঠনটি নিজের নামে রাজনৈতিক অনুদান দিতেই চাইছে না।
আইপ্যাক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বুধবার নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দেওয়া আইপ্যাক মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থনকারী একটি প্যাককে ৯০ লাখ ডলার পর্যন্ত দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল; প্রতিপক্ষ আব্দুল এল-সাইয়েদ ইসরায়েলের কড়া সমালোচক। প্রাইমারিতে এল-সাইয়েদকে হারাতে সংগঠনটি এরই মধ্যে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ করেছে।
সদস্যদের কাছে পাঠানো আইপ্যাকের চিঠিতে নেতৃত্ব স্বীকার করেছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন তাদের জন্য ‘সাম্প্রতিক স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশগুলোর একটি’ এবং সামনের বছরগুলোতে এই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। চিঠিতে তারা লিখেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের লড়াইয়ে জিততে হলে আরও কৌশলী, ফলপ্রসূ ও চটপটে রাজনৈতিক কার্যক্রম গড়তে হবে; তাদের একমাত্র আঁকড়ে ধরা নীতি হলো সবচেয়ে কার্যকর কৌশলটাই বেছে নেওয়া।
আইপ্যাক দাবি করেছে, এই নির্বাচন চক্রে তারা ২৯০ জন প্রার্থীকে জিততে সাহায্য করেছে এবং তাদের ভাষায় ‘ইসরায়েলবিরোধী’ ২৯ জন প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করেছে। কিন্তু একই সময়ে বড় ধাক্কাও খেয়েছে সংগঠনটি—মিশিগান ও নিউজার্সিতে। অতীতে আইপ্যাকের অনুদান নেওয়া এক ডজনের বেশি প্রার্থী এরপর প্রকাশ্যে সংগঠনটি থেকে দূরত্ব ঘোষণা করেছেন। নিউইয়র্কের প্রতিনিধি প্যাট রায়ান গত সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি সংগঠনটির কাছ থেকে নেওয়া প্রায় আড়াই লাখ ডলার ফেরত দেবেন।
জিউইশ ভয়েস ফর পিস অ্যাকশনের রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেছেন, এই কৌশল বদলের মধ্য দিয়ে আইপ্যাক প্রকাশ্যেই স্বীকার করল যে রাজনৈতিক জগতে তাদের ব্র্যান্ড বিষাক্ত হয়ে গেছে; কমে আসছে সেই প্রার্থীর সংখ্যা, যারা প্রকাশ্যে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে চান।
তবে পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, বাস্তবে খুব বেশি কিছু বদলাবে না। আইপ্যাকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই নির্বাচন চক্রে সংগঠনটির সদস্যরা প্রার্থীদের ৯ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন—যেখানে সরাসরি প্যাকের মাধ্যমে সংগঠনটির নিজের অনুদান ছিল মাত্র ৩০ লাখ ডলার। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র কর্মকর্তা হাদি আমর বলেছেন, এটা নতুন কিছু নয়; আইপ্যাক তার পুরোনো, পরীক্ষিত পথেই ফিরে যাচ্ছে।
ট্র্যাক আইপ্যাক ও রিজেক্ট আইপ্যাক ক্যাম্পেইনের মতো উদ্যোগগুলো বলছে, কম দৃশ্যমান পথে অর্থ পাঠানোর কৌশল নিয়ে আইপ্যাক আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিল। ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং পলিসি প্রজেক্টের হামিদ বেনদাসের মন্তব্য, সমর্থন ও সরাসরি অনুদান ছেড়ে দিয়ে আইপ্যাক দাতাদের সংকেত দেওয়ার একটি হাতিয়ার হারালেও তাদের হাতে আরও অনেক হাতিয়ার রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে ঘোষণাটি আমেরিকার রাজনীতিতে একটি যুগের বাঁক বদলের সাক্ষ্য দিচ্ছে: ইসরায়েল প্রশ্নে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার হিসাব বদলে গেছে। তবে অর্থের প্রবাহ থামছে না—শুধু সেই প্রবাহের গায়ে আইপ্যাকের নামের ছাপ আর থাকছে না।






