অনাগরিক ভোটার খোঁজার অভিযানে লাগাম টানলেন মার্কিন বিচারক, নয়টি রাজ্যে মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রে অনাগরিক ভোটার খোঁজার নামে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) মাঠপর্যায়ের অভিযানে সীমা বেঁধে দিয়েছেন এক ফেডারেল বিচারক। ক্যালিফোর্নিয়ার বিচারকের মতে, এই তৎপরতায় ব্যবহৃত তথ্য ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি সম্ভবত ভোটার ভীতি নিষিদ্ধ করা ভোটাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের (এইচএসআই) সশস্ত্র কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে অনাগরিক হয়েও অবৈধভাবে ভোট দিয়েছেন বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই তালিকায় এমন ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন, যাঁরা নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে ভোট দিয়েছিলেন।
বুধবার গভীর রাতে দেওয়া ১৯ পৃষ্ঠার আদেশে মার্কিন জেলা বিচারক আরাসেলি মার্তিনেজ-ওলগিন লিখেছেন, ফেডারেল সরকার এই উদ্যোগে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ তথ্য ব্যবহার করছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নিয়োগপ্রাপ্ত এই বিচারক বলেন, সরকারের প্রচেষ্টা সম্ভবত ভোটাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে।
বিচারক গত মাসে এক মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা (ইউএসসিআইএস) হুইসেলব্লোয়ারের প্রকাশ করা তথ্যের কথা উল্লেখ করেন। তাতে অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকায় সম্ভাব্য অনাগরিকদের লক্ষ্য তালিকা তৈরিতে তাড়াহুড়ো করে তথ্য মেলানো হয়েছে এবং সেই তালিকায় মার্কিন নাগরিকরাও রয়েছেন।
তিনি এইচএসআইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোর দিকেও ইঙ্গিত করেন, যার একটিতে অবৈধভাবে ভোটের নিবন্ধনের অভিযোগে ক্যালিফোর্নিয়ার এক ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানোর ছবি দেখানো হয়েছিল।
বিচারক লিখেছেন, সরকারের অবিশ্বস্ত ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ব্যবহার এবং ব্যাপক প্রচার পাওয়া গ্রেপ্তারগুলো ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার বস্তুনিষ্ঠভাবে যুক্তিসংগত ভয় তৈরি করে, যা নাগরিকদের অন্যের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত বা সহায়তা করা থেকে ভীত করে।’
মামলায় উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, এইচএসআইয়ের মাঠ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়া, কানেকটিকাট, জর্জিয়া, মিসৌরি, নেভাদা, নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া, ওয়াশিংটন ও উইসকনসিনে।
মার্তিনেজ-ওলগিন ওই রাজ্যগুলোতে ডিএইচএস কর্মকর্তাদের এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে মাঠ অভিযান চালাতে নিষেধ করেছেন, যাঁদের তাঁরা জানেন, সন্দেহ করেন বা যুক্তিসংগতভাবে জানা বা সন্দেহ করা উচিত যে তাঁরা মার্কিন নাগরিক; অথবা যেসব অভিযান পরবর্তী তদন্ত ছাড়াই পুরোপুরি ইউএসসিআইএসের তথ্য মেলানোর ওপর ভিত্তি করে।
ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা নিকোলাস বার্টেল বিচারককে দেওয়া এক ঘোষণায় বলেছিলেন, তাঁর দল এইচএসআইয়ের কাছে পাঠানোর আগে নথিপত্র হাতে যাচাই করে, তবে নাগরিকদের ভুলভাবে ‘সম্ভাব্য বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ‘কম সম্ভাবনার’ কথা স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, সুরক্ষাব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানো হয়েছে এবং বাকি ঝুঁকি সংস্থার আইন প্রয়োগ ও নির্বাচনী সততার লক্ষ্যের প্রয়োজনীয়তায় ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই আদেশ ফেডারেল সরকারের ব্যাপক প্রচারিত অনাগরিক ভোটার খোঁজার অভিযানে আসলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। রাজ্যগুলোর পর্যালোচনা ও নিরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, অনাগরিকদের ভোট দেওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
ডিএইচএস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ডিএইচএস যেসব বিদেশি ভোট দেন এবং মার্কিন নাগরিকদের ভোটকে ম্লান করেন, তাঁদের শনাক্ত, বিচার ও অপসারণে সম্পূর্ণ মনোযোগী। কেবল আমেরিকানদেরই আমেরিকান নেতা নির্বাচন করা উচিত।’ সংস্থাটি বলেছে, যাঁদের তারা মার্কিন নাগরিক বলে বিশ্বাস করে, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
আদেশটি শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা এবং নির্বাচনের রাত পর্যন্ত বহাল থাকবে, যদিও ফেডারেল সরকার আপিল করতে পারে। মামলাটি গত মাসে সান ফ্রান্সিসকো ও সান্তা ক্লারা কাউন্টি, সান ফ্রান্সিসকো শহর, নার্সদের ইউনিয়ন ও ভোটো লাতিনো ফাউন্ডেশনসহ একটি জোট দায়ের করেছিল; ডিএইচএস ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মামলাটি লড়ছে প্রোটেক্ট ডেমোক্রেসি ও ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টার।
প্রোটেক্ট ডেমোক্রেসির আইনজীবী বো ট্রেমিতিয়ের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজ আদালত আমাদের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি নিশ্চিত করেছেন: ভোট দেওয়া একটি মৌলিক অধিকার, যা নাগরিকরা—এখানে জন্মানো হোক বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত—সশস্ত্র সরকারি এজেন্টদের হয়রানি ছাড়াই প্রয়োগ করতে পারা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল ডিএইচএস খারাপ তথ্যের ওপর তালিকা বানিয়েছে, কতবার ভুল হচ্ছে তা যাচাই করেনি এবং নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে বেপরোয়াভাবে মানুষের বাড়িতে এজেন্ট পাঠিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন ও ন্যাশনাল নার্সেস ইউনাইটেডের এক আদালত নথিতে বর্ণনা করা হয়েছে, কীভাবে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা ফেডারেল অভিযানের কারণে রাজনৈতিক সমাবেশে যেতে, নির্বাচনে পোল কর্মী হিসেবে নাম লেখাতে বা সশরীরে ভোট দিতে আর ইচ্ছুক নন। এর পাশাপাশি বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে এমন ২০ হাজার ব্যালট আলাদা করার দাবি জানিয়েছে, যাঁদের ফেডারেল কর্মকর্তারা ‘সম্ভাব্য’ অনাগরিক বলে মনে করেন; লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন কর্মকর্তাদের নমুনা যাচাইয়ে দেখা গেছে, তালিকার অনেক নিবন্ধনই বাতিল, নিষ্ক্রিয় বা ভোটের ইতিহাসহীন, আর কারও কারও ক্ষেত্রে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছেন বলেও উল্লেখ ছিল। সোমবার বিচার বিভাগ রাজ্যজুড়ে ২৮ জন গ্রিন কার্ডধারীর বিরুদ্ধে অবৈধ ভোট বা নিবন্ধনের অভিযোগও ঘোষণা করেছে।






