ডেঙ্গুতে এক দিনে আরও ৪ মৃত্যু, ভর্তি ১,৫১২ জন; হাসপাতালে রোগীর চাপে হিমশিম সেবা
ডেঙ্গু রোগীর স্রোত যেন থামছেই না। প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, আর সেই চাপে রাজধানীসহ দেশের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা হিমশিম খাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে এই চারজনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫১২ জন।
গত বছরের তুলনায় এ বছর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। গত বছর শুরু থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩৬৭ জন। আর এ বছর শুরু থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন, যা প্রায় দ্বিগুণ।
মৃত্যুর হিসাবেও চিত্র উদ্বেগজনক। গত বছরের এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন ২৫৫ জন। আর এ বছর মারা গেছেন ৩৬৮ জন, যা গত বছরের চেয়ে বেশি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি জানা যায়। ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ থাকলেও পূজার ছুটির কারণে দুই-তিন দিন ধরে বেড কিছুটা ফাঁকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত নার্সেরা।
ডেঙ্গু রোগীর পুরুষ ওয়ার্ডের কর্তব্যরত একজন নার্স বলেন, এই ওয়ার্ডে সিট আছে ৫০টি, আর রোগী আছে ৩৮ জন। তাঁর ভাষায়, এখানে পা রাখার মতো জায়গা থাকে না; এখন পূজার ছুটির জন্য দুই-তিন দিন ধরে বেড কিছুটা ফাঁকা আছে, অন্য সময়ে এমন অবস্থা দেখা যায় না।
মহিলা ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স জানান, এই ওয়ার্ডে মোট ৪১টি বেড রয়েছে, বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন ২৩ জন। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১৮ জন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। পূজার ছুটির কারণে রোগীর চাপ কিছুটা কম; এদিন সকাল থেকে চার-পাঁচজন রোগী এসেছেন, এর আগে ওয়ার্ডের ৪১টি বেডই পূর্ণ ছিল।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ওয়ার্ড পুরুষ এবং ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ড নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত। এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে। নির্ধারিত ওয়ার্ড দুটিতে রোগীর চাপ বাড়লে এসব কর্নারে রোগীদের পাঠানো হয়।
শ্যালক ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে নিয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মহিউদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, তিন দিন ধরে তাঁর শ্যালক অসুস্থ। বুধবার তিনি নরসিংদীতে তাঁদের বাসায় ছিলেন, সেখানকার একটি ল্যাবে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে। এরপর তাঁকে ঢাকায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। মহিউদ্দিন বলেন, হাসপাতালে আসার পর বেড পেতে কোনো সমস্যা হয়নি, চিকিৎসাও ভালো হচ্ছে এবং ওয়ার্ডের কর্মীদের আচরণ ও সেবার মান ভালো।
চার দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছোট ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন হুমায়ুন কবির স্বপন। সোমবার থেকে হাসপাতালে থাকা স্বপন বলেন, এসেই বেড পেয়েছেন, কোনো সমস্যা হয়নি, চিকিৎসাও মোটামুটি ভালো হচ্ছে এবং চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা নিয়ে বড় কোনো অভিযোগ নেই। তবে চিকিৎসক কিছুটা কম মনে হয়েছে, যা পূজার ছুটির জন্য হতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
তবে অন্য ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন স্বপন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডের অবস্থা মোটামুটি ভালো হলেও অন্যান্য ওয়ার্ডের অবস্থা ভালো নয়। ২৫ দিন ধরে বাবাকে নিয়ে অন্য ওয়ার্ডে ভর্তি থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে নারী ও পুরুষকে একই ওয়াশরুম ব্যবহার করতে হতো, অনেকটা জেলখানার মতো অবস্থা। বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে লিফটের স্বল্পতা—এত বড় হাসপাতাল, কিন্তু লিফট মাত্র কয়েকটা।
জরুরি সেবা পেতে সমস্যার কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে টিকিট কাউন্টার বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালে অনেক রোগী আসেন; বিশেষ করে ৬০ থেকে ৮৫ বছর বয়সী গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। টিকিট না কাটলে চিকিৎসক দেখানো যায় না, এতে জরুরি চিকিৎসা পেতে সমস্যা হয়। প্রয়োজনে আরও কর্মী নিয়োগ দিয়ে কাউন্টার বাড়ালে মানুষের সুবিধা হবে বলে তিনি মনে করেন।
জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালে কর্তব্যরত একজন। তিনি বলেন, হাসপাতালের বড় ওয়ার্ডে ১৭০ থেকে ২৫০ জন রোগী থাকেন, সেখানে দুজন নার্স দিয়ে এত রোগীকে সেবা দেওয়া কীভাবে সম্ভব? অথচ তাঁদের ওয়ার্ডে একজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। বড় ওয়ার্ডগুলোতে জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অনেক চাপ পড়ে।
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে অনেক বেশি রোগী আসেন, ফলে কাজের চাপও অনেক বেশি। কিন্তু রোগী যত জনই আসুক, সেবা দিতেই হবে। একজন নতুন রোগী আসার পর তাঁর প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে—স্যালাইন দেওয়া, ল্যাব পরীক্ষা করানো, রক্ত দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াসহ অনেক কাজ করতে হয়। প্রায় সব জায়গাতেই নার্সের সংকট রয়েছে; জনবল বাড়ানো না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, শুধু হাসপাতালে গিয়ে স্যালাইন পরীক্ষা করলেই হবে না, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কেমন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কি না এবং পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে কি না, সেগুলোও দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন হাসপাতালের সেবাব্যবস্থার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করেছে। রোগীর স্রোত কমা এবং জনবল সংকটের সমাধান—দুটির ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।






