দিনে ঘন ঘন ঘুম: স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দিল নতুন গবেষণা
বয়স্কদের দিনের বেলায় ঘন ঘন ঘুমিয়ে পড়া স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দ্য জার্নাল অব জেরোন্টোলজি: মেডিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রায় প্রতিদিনই দিনে ঘুমান, তাঁদের ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকেরা এই গবেষণা চালিয়েছেন। তাঁরা ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় এক হাজার প্রাপ্তবয়স্ককে অনুসরণ করেছেন, যাঁদের গবেষণা শুরুর সময়ে, অর্থাৎ ২০১৩ সালে, স্মৃতি বা চিন্তাশক্তির কোনো সমস্যা ছিল না।
এক দশক পরে গবেষকেরা দেখতে পান, দিনের ঘুমের অভ্যাস—কত ঘন ঘন ঘুম আসে, কতক্ষণ ঘুম হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘুমিয়ে পড়া হয় কি না—দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ শুধু রাতের ঘুমের দৈর্ঘ্য বা মান দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ঘন ঘন—অধিকাংশ দিন বা প্রতিদিন—দিনে ঘুমিয়েছেন, তাঁদের ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি যাঁরা কদাচিৎ ঘুমান বা কখনোই ঘুমান না, তাঁদের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেশি।
ঘুমটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। যাঁরা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘুমিয়ে পড়তেন, তাঁদের ঝুঁকি ছিল ৩৯ শতাংশ বেশি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, ছোট ঘুমের ক্ষেত্রেও ফল খারাপ দেখা গেছে।
৩০ মিনিট বা তার কম সময়ের ঘুমের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে, অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও। ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমের ক্ষেত্রে রাতের ঘুমের ধরন বিবেচনায় নিলে এই সম্পর্ক তুলনামূলক কম স্পষ্ট হয়েছে।
গবেষক দলের মতে, দিনের ঘুমের ধরন দেখলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের এমন একটি চিত্র পাওয়া যায়, যা শুধু রাতের ঘুম দিয়ে ধরা যায় না। ব্লুমবার্গ স্কুলের অধ্যাপক অ্যাডাম স্পিরা এবং পোস্টডক্টরাল ফেলো কেনিং জিয়াং বলেছেন, কত ঘন ঘন ঘুম হয় এবং ঘুমটি ইচ্ছাকৃত কি না—এসব বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা জরুরি।
তাঁরা বলেছেন, এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ দিয়েছে যে ঘন ঘন ও অনিচ্ছাকৃত দিনের ঘুম বয়স্কদের ডিমেনশিয়া ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে যুক্ত। রাতের ঘুমের দৈর্ঘ্য, দিনের ঝিমুনি এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক টিকে ছিল।
গবেষকেরা অবশ্য পরিষ্কার করেছেন, দিনের ঘুম যে সরাসরি মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটায়, তা এই গবেষণা প্রমাণ করে না। বরং ঘুমের অভ্যাস বদলে যাওয়া মস্তিষ্কের ভেতরে চলা প্রাথমিক পরিবর্তনের একটি আগাম সতর্কসংকেত হতে পারে।
তাঁদের ব্যাখ্যা, জেগে থাকা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে মস্তিষ্কের এমন অংশগুলো ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করতে পারে, যার ফলে দিনে ক্লান্তি ও ঘুম বাড়তে পারে। দিনের ঘুম আবার রাতের ঘুমের চাহিদা কমিয়ে রাতের ঘুমে ব্যাঘাতও ঘটাতে পারে, যা নিজেই আরেকটি ঝুঁকির কারণ।
ফলাফল যাচাই করতে গবেষকেরা প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে ডিমেনশিয়া হওয়া ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে আবার বিশ্লেষণ করেছেন। তাতেও ঘন ঘন ও অনিচ্ছাকৃত ঘুমের সঙ্গে ঝুঁকির সম্পর্ক একই রকম শক্তিশালী ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়ের বহু বছর আগেই ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা এবং এর সীমাবদ্ধতা আছে। তাঁরা অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের আচরণে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দেখেননি যে অভ্যাস বদলালে ঝুঁকি বদলায় কি না। তবু তাঁদের মতে, বয়স্কদের দিনের ঘুমের ধরন, বিশেষ করে ঘুম ঘন ঘন বা অনিচ্ছাকৃত হয়ে উঠলে, নজরে রাখা মূল্যবান হতে পারে।






