‘আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই’: নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফের জন্য দুই জায়গায় মানববন্ধন, মায়ের কান্নায় ভারী পরিবেশ
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও জেলা শহরে মানববন্ধন করেছেন নিহতের স্বজন, এলাকাবাসী ও সাংবাদিকেরা। বৃহস্পতিবার দুটি আলাদা কর্মসূচিতে একই দাবি উঠে এসেছে — এই হত্যার বিচার যেন দ্রুত ও দৃশ্যমান হয়।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে কলমাকান্দা উপজেলার গোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামে আলিফের নিজ বাড়ি ফকিরবাড়ি মোড়ে প্রথম মানববন্ধনটি হয়। এতে তাঁর পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী অংশ নেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মানববন্ধনে আলিফের মা জোবেদা আক্তার, বড় ভাই শহীদুল ইসলাম ফকির ও সাদেক ফকির, বোন কল্পনা আক্তার ও মিলা, স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হাসান, স্কুলশিক্ষক এবং সাবেক ইউপি সদস্য সঞ্চয় নন্দীসহ এলাকাবাসী অংশ নেন। পরিবারের প্রায় সবাই উপস্থিত থাকায় কর্মসূচিটি ছিল আবেগঘন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জোবেদা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’ তাঁর এই বক্তব্যই দিনের দুই কর্মসূচির মূল সুর হয়ে ওঠে। অন্য বক্তারাও আলিফ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
একই দিন বেলা ১২টার দিকে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়ায় জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আরেকটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। রুরাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুখলেছুর রহমান, সাংবাদিক এরশাদুল হক জনিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকেরা অংশ নেন।
দ্বিতীয় মানববন্ধনের বক্তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানান। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের ওপর হামলা-হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার না হলে একই ঝুঁকি বারবার ফিরে আসে।
ঘটনার পেছনের চিত্রটি হলো, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আটজনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলার তদন্তে এ পর্যন্ত দুজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ১৮ অক্টোবর অপূর্ব নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়; পরে তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণ নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় — তাঁকেও তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। প্রাঙ্গণকে (২১) নেত্রকোনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ হাজির করে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছে পুলিশ। তিনি আরও বলেন, পুলিশ মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে; দ্রুত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
নিহত আলিফ বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি — তাঁর এই কাজের সঙ্গে হত্যার কোনো যোগ আছে কি না, তা নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে, যদিও তদন্তকারীরা এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাননি।
প্রসঙ্গত, নেত্রকোনা সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় অনেক সময় অপরাধীরা অপরাধ সংঘটিত করে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে; এতে আসামিদের গ্রেপ্তারে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়। পুলিশ বলছে, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কাজ করছে।
বৃহস্পতিবারের দুই মানববন্ধনের পর এখন নজর তদন্তের অগ্রগতির দিকে। পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের দাবি একটাই — শুধু সন্দেহভাজন গ্রেপ্তারেই থেমে না থেকে মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হোক, যাতে জোবেদা আক্তারের কথায়, তিনি নিজে তাঁর ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে পারেন।






