'বোকামিপূর্ণ কথা': ট্রাম্পের মন্তব্য পাত্তাই দিল না ফরাসিরা
ফ্রান্সে চলমান ব্যাপক বিক্ষোভ, দাঙ্গা ও সহিংসতার ঘটনায় দেশটিতে যখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন এ নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দোষারোপের লড়াই। ফরাসি বিক্ষোভের পেছনে অভিবাসী ও উন্মুক্ত সীমান্ত নীতি দায়ী — যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবিকে 'বোকামিপূর্ণ কথা' বলে উড়িয়ে দিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রসমাজ।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইউরোপ যদি অবিলম্বে তাদের সীমান্ত বন্ধ না করে ও অপরাধীদের বহিষ্কার না করে, তাহলে ইউরোপের পতন অনিবার্য। ফ্রান্স ও ইতালির বিশৃঙ্খলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'এটি কোনো স্কুলের বিষয় নয়, এটি এমন কিছু মানুষের দেশগুলোতে প্রবেশ করা যারা এই দেশগুলোকে ঘৃণা করে।'
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। কাতারে এক সরকারি সফরে গিয়ে তিনি কোনো নেতার নাম উল্লেখ না করে বলেন, 'অনেকেই, যার মধ্যে বিদেশি নেতারাও রয়েছেন, এমন সব বোকামিপূর্ণ মন্তব্য করছেন।' তিনি স্পষ্ট করেন, বর্তমান দাঙ্গার পেছনে কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ মেলেনি।
ফরাসি তরুণ ও শিক্ষার্থীরাও ট্রাম্পের এমন দাবিকে পাত্তা দেননি। প্যারিসের নিকটবর্তী পল এলুয়ার হাইস্কুলের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী বিলাল নারজিচ্চি ট্রাম্পের বক্তব্যকে 'বোকামিপূর্ণ কথা' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, 'তারা যা খুশি ভাবতে পারে। আমরা আমাদের মূল দাবিতেই স্থির আছি, যা শিক্ষার্থীদের অধিকারের সঙ্গে জড়িত। উগ্র ডানপন্থীরা বরাবরই ভীতি সৃষ্টি করে নিজেদের রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে চায়।'
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন ভোটারদের প্রভাবিত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল। ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড পলিটিক্যাল অ্যানালাইসিসের ইউরোপীয় পারস্পেক্টিভ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল দুপুয় মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সে যা ঘটছে, যুক্তরাষ্ট্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হবে — এমন ভয় দেখানোর জন্যই এই কৃত্রিম যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ফ্রান্সে মূলত হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হলেও চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে তা সহিংস রূপ নেয়। দাঙ্গাকারীদের একাংশ বিভিন্ন সিটি হলে হামলা ও ব্যাপক লুটপাট চালায়। বিগত বছরগুলোর মধ্যে একে ফ্রান্সের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় দুই হাজারের বেশি মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যার বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বেশ কিছু শহরে আংশিক কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ফ্রান্সের এই অস্থিরতার ঢেউ ইউরোপীয় অন্যান্য দেশেও আলোড়ন তুলেছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রান্সে ভবন পোড়ানোর ভিডিও শেয়ার করে বলেন, অভিবাসনের বিষয়ে হাঙ্গেরি কেন সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তা এখন সবার কাছে পরিষ্কার।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সুর চড়িয়ে বলেন, পোল্যান্ড অন্য দেশের ভুল পুনরাবৃত্তি করবে না এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা আপোসহীন থাকবেন।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপের সমালোচনা করে বলেন, 'পশ্চিমা উদারতাবাদীরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির নামে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে তৃতীয় বিশ্বের লোকজনকে আমদানি করেছে এবং আত্মীকরণের মৌলিক বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছে।'
সমালোচকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। সেই অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের অস্থিরতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
কানসাসের এক নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প মার্কিন ভোটারদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'এই নির্বাচনে কী ঝুঁকি রয়েছে তা দেখতে চাইলে ফ্রান্সে কী ঘটছে সেদিকে তাকান।'
ট্রাম্পের মন্তব্যের বিপরীতে ফরাসি কর্তৃপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট — বিক্ষোভের শিকড় দেশের ভেতরের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে; অভিবাসনকে এর জন্য দায়ী করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য বলে তারা মনে করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের বিক্ষোভ ও ট্রাম্পের মন্তব্যকে ঘিরে আটলান্টিকের দুই পাড়ে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রশাসন ইউরোপের ঘটনাকে আরও জোরালোভাবে ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে।





