ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কা সামলাতে ৬২০ কোটি ডলারের প্যাকেজ কানাডার: ইস্পাত ও গাড়ি শিল্পকে বাঁচাতে কার্নির বড় ঘোষণা
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের ধাক্কা থেকে নিজের ইস্পাত ও গাড়ি শিল্পকে রক্ষা করতে ৬২০ কোটি কানাডীয় ডলারের (৫৭০ কোটি ইউরো) প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কানাডা। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন কয়েক দশকে গড়ে ওঠা একটি বাণিজ্য সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে।
বুধবার কার্নি ও অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড যৌথভাবে এই পরিকল্পনা উন্মোচন করেন। প্যাকেজে ইস্পাত নির্মাতাদের জন্য ৩৭০ কোটি ডলার (৩৪০ কোটি ইউরো) এবং গাড়ি নির্মাতাদের জন্য ১৮০ কোটি ডলার (১৬৫ কোটি ইউরো) বরাদ্দ রাখা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য; গাড়ি খাতের অর্থের মধ্যে ১১০ কোটি ডলার (১০০ কোটি ইউরো) আসবে অটোয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে।
ঘোষণাটি এসেছে এমন এক দিনে, যেদিন মার্কিন মালিকানাধীন ক্লিভল্যান্ড-ক্লিফস অন্টারিওর হ্যামিল্টনে তাদের কারখানায় ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে—যা বাণিজ্য বিরোধের মানবিক মূল্যকেই সামনে এনেছে।
কার্নি বলেন, ‘মার্কিন শুল্ক কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান একটি বাণিজ্য সমঝোতাকে উল্টে দিয়েছে। এসব শুল্ক আমেরিকান পরিবারগুলোর খরচ বাড়িয়েছে, আর অন্টারিওর শ্রমিক ও ব্যবসাগুলোকে পিছিয়ে দিয়েছে।’
গাড়ি খাতের ক্ষতি ইতোমধ্যে বাণিজ্য পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার গাড়ি রপ্তানি ১০ শতাংশের বেশি কমেছে, অন্যদিকে কানাডায় মার্কিন রপ্তানি কমেছে ২০ শতাংশের বেশি—কার্নির ভাষায়, এই পতন সীমান্তের দুই পাশেরই ক্ষতি করছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘শুল্ক আমাদের দুই দেশের শিল্পকেই দুর্বল করে এবং আমাদের পরিবারগুলোর জন্য পছন্দের সুযোগ কমিয়ে দেয়।’
কার্নি নিশ্চিত করেছেন, বুধবার তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন; আলোচনায় বাণিজ্যের পাশাপাশি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ও উঠে এসেছে।
তবে কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত তিনি দেননি; শুধু বলেছেন, কানাডা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রয়েছে। গত আগস্টে ট্রাম্প প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের (১ হাজার ৮৪০ কোটি ইউরো) কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে আলোচনা ভেঙে যায়, যার জবাবে কানাডাও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়।
ফোর্ড দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এই বিরোধের প্রভাব নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে যাই হোক, হোয়াইট হাউসে যেই বসুন, আমরা আর আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছি না।’
কার্নি এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজারে কানাডার রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তাঁর এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, সমন্বিত উত্তর আমেরিকান গাড়ি শিল্প আর ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নাও থাকতে পারে বলে মনে করছে অটোয়া।
কার্নি বলেন, ‘তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। সুতরাং আমাদেরও বদলাতে হবে।’
এদিকে দিনটিতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়, যখন মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে কানাডীয় রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে আগামী মাসের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টার অভিযোগ তোলে।
দূতাবাস শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলির নাম উল্লেখ করে—রিপাবলিকান রাজ্যগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা শুল্ক নিয়ে তাঁর আলোচনার জন্য—এবং ফোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, কারণ তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের শুল্ক-সমালোচনামূলক বক্তব্য সংবলিত একটি মার্কিন টেলিভিশন বিজ্ঞাপন চালিয়েছিলেন; ওই বিজ্ঞাপনের কারণেই ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে গিয়েছিলেন।
দুই নেতাই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন; স্বাধীন বিশ্লেষকেরাও তাই করেছেন। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক দানিয়েল বেলাঁ বলেন, ‘কানাডা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে—এই অন্তর্নিহিত ধারণাটাই অযৌক্তিক।’ ফলে শুল্কযুদ্ধের অর্থনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ওয়াশিংটন-অটোয়া সম্পর্কে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও এখন প্রকাশ্য।





