হুথি হামলার তীব্রতায় সৌদি আরব থেকে কর্মী সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, পাল্টা হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ইরান-সমর্থিত হুথিদের প্রাণঘাতী হামলা তীব্র আকার নেওয়ায় সৌদি আরব থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নিয়োজিত মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট বুধবার নিশ্চিত করেছেন, বাধ্যতামূলক এই প্রত্যাহারের নির্দেশ শুধু সৌদি আরবের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে যে খবর বেরিয়েছিল, তিনি তা নাকচ করে দিয়েছেন।
পিগট বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু সৌদি আরবেই জরুরি-বহির্ভূত মার্কিন সরকারি কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রত্যাহারের আদেশ জারি করেছে। তাঁর ভাষায়, ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শত্রুতা বাড়িয়েছে; বেসামরিক বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলায় বেসামরিক হতাহত এবং ভ্রমণে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবে বেসামরিক মানুষ মারা গেছেন, বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য দেশটিকে মিত্রদের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। সর্বশেষ খবরে, সৌদির একটি তেলক্ষেত্রে হুথিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে; তার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দুজন নিহত হয়েছেন।
সশস্ত্র সংঘাতের তথ্য সংগ্রহকারী প্রকল্প এসিএলইডির হিসাবে, চলতি মাসের এক সপ্তাহেই সৌদি আরবের ওপর হুথি হামলা ও হামলার চেষ্টা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ৫ অক্টোবর থেকে রিয়াদ, জিজান, নাজরান, দাম্মাম ও আবহার বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয়েছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে; সেখানে অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে বারবার হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে।
ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে সৌদি আরব মিত্রদের কাছে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চেয়েছে। যুক্তরাজ্য মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে, সৌদি শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় তারা টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাবে। মিসরও রাজ্যটিকে সহায়তা করছে এবং ইসরায়েল সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে।
রিয়াদ ওয়াশিংটনের কাছে অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক চেয়েছে, যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক চাহিদার চাপে উপলব্ধ সরবরাহ সংকটে রয়েছে।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, তিনি সেদিন সৌদি আরবের সঙ্গে কথা বলেছেন; তারা ইন্টারসেপ্টর চায়, ইসরায়েলও ইন্টারসেপ্টর চায়, যুক্তরাষ্ট্রও ইন্টারসেপ্টর চায় — পৃথিবীর প্রতিটি দেশই এখন ইন্টারসেপ্টর চায়। এই অস্ত্রকে তিনি বর্তমানে প্রতিরক্ষা খাতের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পণ্য বলে বর্ণনা করেছেন; মিত্রদের চাহিদা ও নিজেদের সামরিক প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা থাকলেও সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ড রক্ষা করা কতটা কঠিন। চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেছেন, সৌদি আরব রক্ষা করার জন্য বিশাল ভূগোল রয়েছে; তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীও অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক বাহিনীর জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর ভাষায়, হুথিরা নিজেরা খুব বেশি খরচ না করেই বিপুল ব্যয় চাপিয়ে দিতে পারছে।
ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যোগ দেবে। তাঁর ভাষায়, হয়তো দেবে; তারা বিষয়টি দেখবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন এবং খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় দুই মাস ধরে বোমাবর্ষণ অভিযান চালিয়েছিল ২০২৫ সালে; পরে ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার পর ট্রাম্প সেই অভিযান বন্ধ করেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, আর ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে আরও এক দফা হামলা চালাবেন কি না, তা নিয়ে ভাবছেন। কর্মী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছে।
ফলে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয় — যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় নাকি কূটনৈতিক পথে চাপ বাড়ায় — সেদিকেই এখন সবার নজর।






