হিন্দ রাজাব হত্যায় অভিযুক্ত ইসরায়েলি কমান্ডারকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তারের দাবি কংগ্রেস সদস্য তালিবের
গাজায় পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাব হত্যার জন্য দায়ী বলে মনে করা ইসরায়েলি সামরিক ইউনিটের কমান্ডারকে গ্রেপ্তারের জন্য নিজের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রাশিদা তালিব। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই দাবি জানান।
তালিব ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলি সৈন্য শন গ্লাস যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজাবের মৃত্যুতে গ্লাসের সম্পৃক্ততা তদন্ত করার আইনি দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
তিনি লিখেছেন, ‘গণহত্যা কনভেনশন ও জেনেভা কনভেনশনের পক্ষ হিসেবে আমাদের সরকার এই যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার জন্য তাকে গ্রেপ্তার ও তদন্ত করতে বাধ্য।’ তার এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে।
নিজের পোস্টের অংশ হিসেবে তালিব হিন্দ রাজাব ফাউন্ডেশনের (এইচআরএফ) একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন। সংগঠনটি গাজায় যুদ্ধাপরাধে সন্দেহভাজন ইসরায়েলি সৈন্যদের গতিবিধি অনুসরণ করে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা গ্লাসকে গ্রেপ্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের কাছে জরুরি অনুরোধ দাখিল করেছে। তাদের দাবি, এই গ্রেপ্তারই হবে জবাবদিহির প্রথম পদক্ষেপ।
এইচআরএফ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘শন গ্লাস ‘ভ্যাম্পায়ার এম্পায়ার’ কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন, যারা পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রাজাব, তার পরিবারের সদস্য এবং তাদের উদ্ধারে যাওয়া চিকিৎসাকর্মীদের হত্যায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এইচআরএফের তদন্ত অনুযায়ী, হিন্দের গাড়ির ঠিক আশপাশেই গ্লাস ও তার সৈন্যরা হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত ছিলেন।’
সংগঠনটি আরও বলেছে, ‘আজ গ্লাস যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এইচআরএফ দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ যেন তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে।’
২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি পাঁচ বছর বয়সী শিশুটির হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
রাজাব ও তার পরিবার গাজা সিটি ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাদের গাড়ি ইসরায়েলি গুলির মুখে পড়ে। গুলিতে তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। রাজাব জরুরি সেবায় ফোন করে উদ্ধারকারীদের বলেছিল, ‘আমি খুব ভয় পাচ্ছি। দয়া করে আসুন!’
তার টেলিফোন কলের রেকর্ডিং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজাব এবং তাকে উদ্ধারে যাওয়া দল — দুটোই ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়।
রাজাব যে গাড়িতে ছিল, তাতে ৩৩৫টি গুলির ছিদ্র পাওয়া গিয়েছিল। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ শুরুতে এর জন্য ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সঙ্গে গোলাগুলিকে দায়ী করেছিল। তবে ফরেনসিক আর্কিটেকচার নামের একটি সংগঠনের তদন্তে গোলাগুলির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, ঘটনার সময় ওই এলাকায় শুধু ইসরায়েলি বাহিনীই উপস্থিত ছিল।
ইসরায়েল এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করেছে, তবে ফিলিস্তিনিদের কাছে এ ধরনের তদন্তকে জবাবদিহি এড়ানো এবং ক্ষোভ প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের উপায় হিসেবেই দেখা হয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা গাজায় ইসরায়েলের হামলাকে গণহত্যা বলে ঘোষণা করেছেন; কমপক্ষে ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কমপক্ষে ২১ হাজার শিশু। গাজায় নিয়মিত যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিন্দাও করেছে। এখন তালিবের দাবির পর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।



