খুলনার বটিয়াঘাটায় যুবদল নেতা বাহাদুরের বিরুদ্ধে জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ, অস্বীকার তাঁর
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে জমি দখল, সরকারি খাল দখল, বালুমহাল দখল, চাঁদাবাজি ও কমিশন-বাণিজ্য করে কোটিপতি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পেশিশক্তি ও অর্থের জোরে তিনি পদ বাগিয়েছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এসব অভিযোগে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ এবং স্থানীয় যুবদলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বিব্রত বলে জানা গেছে, যদিও বাহাদুর সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে তিনি পোস্টারও ছাপিয়েছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন স্থানীয় রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নগরীর রায়েরমহল এলাকার বাসিন্দা নাছিমা হাসান বলেন, তাঁর স্বামী ইমাম হাসান বাচ্চু বেঁচে থাকাকালে ২০১৫ সালের ৮ মার্চ বটিয়াঘাটার রাঙ্গেমারী গ্রামে ১৪ শতক জমি কিনে বাউন্ডারি ওয়াল ও আরসিসি ঢালাই দিয়ে দোকান নির্মাণ করেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাহাদুর জাল দলিল করে জমিটির একাংশ দখলের চেষ্টা করেন বলে তাঁর অভিযোগ।
নাছিমার ভাষায়, বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর ৫ অক্টোবর ওই জমি দখল করেন বাহাদুর। এ ঘটনায় তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অগ্রক্রয় মামলা করেন। আদালত শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিলে তা না মেনে ১৩ অক্টোবর তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও তিনি জানান। পরে ওই দিন অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনকে আসামি করে মামলা করলেও এখন তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
বটিয়াঘাটার সাচিবুনিয়া এলাকার বিভাস গোলদার অভিযোগ করে বলেন, চক্রাখালী বাজারে তাঁর পৈতৃক সম্পত্তিতে দোকান নির্মাণ করে তিনি ভাড়া দেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাহাদুর ব্যক্তিগত অফিসের জন্য একটি দোকান ভাড়া নেন। এর কয়েক মাস পর বাহাদুর বলেন, এই দোকানগুলো তাঁর নিজের, তাঁর দলিল আছে। বিভাস বলেন, ‘আমি হিন্দু মানুষ, কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না। এ কারণে মামলা-মোকদ্দমায় যাইনি।’
আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে চক্রাখালী বাজারে আকরাম নামের একজনের সাতটি দোকান দখল করেছেন বাহাদুর—এমন অভিযোগও রয়েছে। তেঁতুলতলা এলাকার মরিয়মের ২৫ শতক জমি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ছয়ঘড়িয়া এলাকায় স্কুলের পাশে একটি দোকানঘর দখলে নিয়ে সেখানে ব্যবসা করছেন বাহাদুরের ভাই বাদশা। এরই পাশে হিন্দুদের জমি দখল করে ভ্যান গ্যারেজ, দোকানঘর ও ফাঁকা জমিতে প্লট করেছেন এই যুবদল নেতা—এমনটাই অভিযোগকারীদের দাবি।
স্থানীয় যুবদলের মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বটিয়াঘাটা বাজারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করেন বাহাদুর ও তাঁর লোকজন। এ ছাড়া পশুর নদের তেঁতুলতলা, পুটিমারি, কাতিয়ানাংলা ও তার আশপাশের এলাকার বালুমহাল দখল করে নিয়ে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবদল নেতা বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বাহাদুর নামের কাউকে আমরা চিনতাম না। হঠাৎ করেই তিনি পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে নানা অপকর্ম করে যাচ্ছেন। তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে দল বিব্রত।’
তবে দখলের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাহাদুর মুন্সী। তিনি বলেন, ‘জমির কাগজপত্র সব ঠিক আছে। তাই আমি কিনেছি ও দখল বুঝে নিছি।’ আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটারও তদন্ত চলছে। কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আমি সঠিকভাবে কাজ করেছি। আমি কোনো আইন ভঙ্গ করি নাই।’ চাঁদাবাজি, বালুমহাল দখলসহ নানা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘দলের সুবিধাভোগীরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘বটিয়াঘাটাসহ চার উপজেলায় বিশেষ অভিযান চলছে। অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তবে জমি বা দখলসংক্রান্ত অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। সে কারণে কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়েই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খানকে বাহাদুরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো জানালে তিনি বলেন, ‘দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি দখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অপকর্ম করে, তার দায় দল নেবে না।’ তিনি বলেন, তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে এলাকায় পরিচ্ছন্ন ইমেজ রয়েছে; কোনো ভূমিদস্যু বা দুষ্কৃতকারীর কারণে এই ইমেজ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তাঁর ভাষায়, দখলদারদের অবস্থান তাঁর কাছে নেই।
এখন অভিযোগ, মামলা ও পাল্টা অস্বীকারের মধ্যে বিষয়টি আদালত ও প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, জমির কাগজপত্রের যাচাই এবং স্থানীয়ভাবে চলমান বিশেষ অভিযানে এই অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্ব পায়, সেটাই নির্ধারণ করবে বটিয়াঘাটার এই বিতর্ক কোন দিকে যায়।





