‘ফাঁসি নাকি ফ্ল্যাগ, সিদ্ধান্ত আপনাদের’ — বেতাগীতে বিএনপির কর্মী সভায় চিফ হুইপের রাজনৈতিক বার্তা
আওয়ামী লীগের ‘ফ’ মানে ফাঁসি আর বিএনপির ‘ফ’ মানে গাড়িতে ফ্ল্যাগ—এই রূপক তুলে ধরে দলীয় নেতাকর্মীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম মণি। বরগুনার বেতাগীতে বিএনপির কর্মী সভায় দেওয়া তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির অভিযোগ, কৃষক ও ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি, চাঁদাবাজি বন্ধের হুঁশিয়ারিসহ নানা প্রসঙ্গ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে বরগুনার বেতাগী উপজেলা শাখা বিএনপির কর্মী সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বিএনপি আপনাদের একটা ‘ফ’ দিয়েছে; আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনীতি করায় আওয়ামী লীগও একটা ‘ফ’ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘ফ’ বড় আর আমাদের ‘ফ’ ছোট।
নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেননি এমন নয়; বিএনপি দিয়েছে গাড়িতে ফ্ল্যাগ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনীতি করায় তারা যে ‘ফ’ দিয়েছে, সেই ‘ফ’-তে ফাঁসি। তাঁর ভাষায়, ‘আপনাদের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে বুঝবেন কোন ‘ফ’-এর সঙ্গে থাকবেন। আপনারা আওয়ামী লীগের ‘ফ’-এর সঙ্গে ফাঁসি নিয়ে থাকবেন নাকি ফ্ল্যাগ নিয়ে থাকবেন, এই সিদ্ধান্ত আপনাদের।’
বক্তব্যে দলের ভেতরের রাজনীতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। চিফ হুইপ বলেন, হাসিনাকে ভোলাবার জন্য নিজেদের মধ্যে কেউ কেউ কৌশল করছে, নানা জাতীয় কথা বলছে। তাঁর প্রশ্ন, পাঁচ মাসের মাথায় তারা কি আন্দোলন করতে পারে? তিনি বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত গ্রুপ। আমরা আপনারা তো একসাথেই আছি। আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, পাঁচ বছর পরে তারেক রহমানের কাজ পছন্দ না হলে ভোট না দিলেই হবে; তাঁর নিজের—নুরুল ইসলাম মণির—কাজ পছন্দ না হলেও ভোট দেওয়ার দরকার নেই। যাকে পছন্দ, তাকেই ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাত নিয়ে তিনি বিগত সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, হাসিনা বিদ্যুৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না—এমন আইন পাস করেছিলেন; সেই আইনে বিদ্যুৎ নিয়ে মামলা করা যাবে না, সংসদে সংশোধনের প্রশ্ন তোলা যাবে না, এমনকি মন্ত্রীদের কাছেও প্রশ্ন করা যাবে না যে বিদ্যুতের কী হলো।
অর্থের অঙ্কও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এক বিদ্যুৎ খাত থেকেই ১ লাখ কোটি টাকার বেশি নিয়ে যাওয়া হয়েছে; আর দেশ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই টাকা দেশের মাটিতে বিছিয়ে দিলে দেশের মাটি দুই ফুট উঁচু হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হাসিনা পরিবারের সদস্যদের নিয়েও অভিযোগ তোলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, হাসিনার ছেলের বিয়ে হয়েছিল, সেই মেয়েকে প্রায় অনেক মিলিয়ন ডলার খরচ করে ডিভোর্স করতে হয়েছে; জয়ের কোনো ব্যবসা নেই, তাহলে অনেক মিলিয়ন ডলার তিনি পেলেন কোথায়—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি। আরেক বোনের ছেলে ফিনল্যান্ডে থাকে, আরেক বোন ও এক বোনের মেয়ে লন্ডনে থাকেন, যার নাম টিউলিপ; দুর্নীতির কারণে তাঁর এমপি পদ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এই পরিবারের বীজ যেখানে যেখানে গেছে, সেখানে সেখানে দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে।
প্রতিশ্রুতির অংশে তিনি বলেন, তারেক রহমান কৃষক কার্ড দেবেন, ফ্যামিলি কার্ড দেবেন; তারেক রহমানই টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করবেন। সারা বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা হবে বলেও জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বিস্তারিত সুবিধার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে চাইলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এক টাকাও ট্যাক্স দিতে হবে না; তিন বছর পর্যন্ত আয়করও দিতে হবে না। উৎপাদন বেশি হলে সরকার প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা করে কিনে নেবে। তাঁর দাবি, আগামী বছর অক্টোবর মাসের ১৮ তারিখে দেখা যাবে, বাংলাদেশে কোনো বিদ্যুতের ঘাটতি নেই; বিদ্যুৎ এতটাই থাকবে যে তা রপ্তানি করা যাবে।
শিক্ষা নিয়েও তারেক রহমানের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। চিফ হুইপ বলেন, তারেক রহমান বলেছেন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে, মানুষ দক্ষ হবে। তারেক সাহেব চান, সন্তানেরা যেন এমন মানুষ হয়, যাতে নিজে কিছু করতে পারে এবং আরও দশজন মানুষকে কাজ করাতে পারে।
স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি নিয়ে কঠোর বার্তা দেন তিনি। কর্মী সভায় উপস্থিত নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের উদ্দেশে তিনি বলেন, চাঁদাবাজ বেতাগীতে থাকতে পারবে না; যারা চাঁদাবাজ আছে, তারা ভালো হওয়ার চেষ্টা করুক। কাজের ব্যবস্থা করা হবে, কাজ করে খেতে হবে; কাজের কোনো কমতি থাকবে না, প্রত্যেকে একটা-দুইটা কাজ পাবে—এমন পরিস্থিতি আছে। কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে চাঁদাবাজি করা চলবে না।
কিশোর গ্যাং নিয়েও সময়সীমা বেঁধে দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দুই মাসের মধ্যে হয় থানার ওসি থাকবে, আর না হয় কিশোর গ্যাং থাকবে; থানার ওসি বলেছে, সে থাকবে। তবে এই কাজ ওসি একা করতে পারবে না, সবাইকে তাঁকে সহযোগিতা করতে হবে। অনলাইন জুয়া বেতাগীতে বন্ধ থাকবে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বেতাগীতে কোনো ভিক্ষুক থাকবে না বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে চিফ হুইপের এই বক্তব্য ছিল একসঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান, অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির মিশেল। ‘ফাঁসি নাকি ফ্ল্যাগ’—এই রূপক দিয়েই তিনি নেতাকর্মীদের সামনে পছন্দের প্রশ্নটি রাখলেন; আর কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, সৌরবিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তুলে ধরলেন আগামী দিনের কর্মসূচি। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিই এখন স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।






