এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্তের ঘোষণা চিফ হুইপের, সৌরবিদ্যুতে মিলবে করছাড় ও সরকারি ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি
আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত হয়ে যাবে—এমনকি বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের কথা জানিয়ে তিনি করছাড়সহ একগুচ্ছ সুবিধার ঘোষণাও দিয়েছেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে বরগুনার বেতাগী উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভাটি ছিল স্থানীয় উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে, তবে তাঁর বক্তব্যের বড় অংশজুড়েই ছিল বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও বিগত সরকারের সমালোচনা।
সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করব। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে তিন বছরের খাজনা দিতে হবে না। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আমদানি করলে ট্যাক্স দিতে হবে না। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পর বাড়তি বিদ্যুৎ থাকলে সরকার কিনে নেবে।’ অর্থাৎ ছাদে বা নিজস্ব উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ বসালে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগও থাকছে।
সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে ২৬ সালের ১৮ অক্টোবর। আমি আপনাদের কাছে বলে গেলাম, ২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখে, আমি এখানে যদি আসি, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বেচার জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ তাঁর এই বক্তব্য অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে ঘাটতির বদলে বিদ্যুতের আধিক্যই হবে দেশের বাস্তবতা।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থার জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘তারা চুরি করেছে, আমরা চুরি করি না, চুরি করব না। এই টাকা দিয়ে আমরা বিদ্যুৎ বানাব।’ দুর্নীতির অর্থ সাশ্রয় করে সেই অর্থই বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানোর অঙ্গীকার করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও কড়া মন্তব্য করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ‘হাসিনার বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট আছে, কিন্তু ভেতরে মেশিন নাই। হাসিনা টাকা খাওয়ার জন্য এসব বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করেছে। তাই এখন বিল কমানোর কোনো রাস্তা সরকারের কাছে নাই।’ তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, বিদ্যুতের বর্তমান বিলের চাপের দায় তিনি আগের সরকারের প্রকল্পগুলোর ওপরই চাপিয়েছেন।
সভায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। দেশে গত দুই বছরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কোনো ঘটনা ঘটেনি দাবি করে চিফ হুইপ বলেন, ‘বাংলাদেশে কেউ সংখ্যালঘু নয়, সবাই এ দেশের নাগরিক, সবার অধিকার সমান।’
দুর্গাপূজা ঘিরে তিনি কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘দুর্গাপূজার দিকে কেউ বাঁকা চোখে তাকালে, সেই চোখ আর সোজা করা যাবে না, সেটা বাঁকাই থাকবে।’ পূজার সময় নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি রক্ষায় এটি ছিল প্রকাশ্য সতর্কবার্তা।
বক্তব্যের পর তিনি বেতাগী উপজেলার অসহায় ও দুস্থ ৩৭টি পরিবারের মাঝে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। এ ছাড়া দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপজেলার সব পূজামণ্ডপে নগদ অর্থ ও জিআর চাল বিতরণ করা হয় তাঁর উপস্থিতিতে।
চিফ হুইপের ঘোষণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরীক্ষা হবে সময়ের। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করছাড়ে সৌর সরঞ্জাম আমদানি, তিন বছরের খাজনা মওকুফ এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকারের কেনার প্রতিশ্রুতি—এসব কার্যকর হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতে আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে তাঁর এক বছরের সময়সীমাটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে সত্যিই বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত হয় কি না এবং সেই উদ্বৃত্ত রপ্তানি বা বিক্রির পর্যায়ে পৌঁছায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে এই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা। আপাতত বেতাগীর সভা থেকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতিই সরকারের বিদ্যুৎ পরিকল্পনার একটি স্পষ্ট রূপরেখা হিসেবে সামনে এসেছে।





