সরাসরি সম্প্রচারিত প্রার্থনাসভায় ক্রুশ ভেঙে পড়ে প্রাণ গেল যাজকের, ইকুয়েডরে শোক
ইকুয়েডরের গুয়াইয়াকিল শহরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক ক্যাথলিক যাজক। সরাসরি সম্প্রচার চলছিল এমন প্রার্থনাসভায় (মাস) কমিউনিয়ন প্রস্তুতের সময় তাঁর ওপর ভেঙে পড়ে একটি বড় কাঠের ক্রুশ। উপাসকদের ছুটে এসে বাঁচানোর চেষ্টার মধ্যেই ঘটে এই মৃত্যু, যা পুরো অনুষ্ঠানকে মুহূর্তে শোক আর আতঙ্কে বদলে দেয়।
নিহত যাজকের নাম ফাদার প্যাট্রিসিও আলফ্রেদো সানচেজ মলিনারি। শনিবার তিনি গুয়াইয়াকিলের নুয়েস্ত্রা সেনিয়োরা দেল পেরপেতুয়ো সোকোরো গির্জার বেদিতে দাঁড়িয়ে কমিউনিয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর পেছনে থাকা বড় কাঠের ক্রুশটি হঠাৎ সামনের দিকে হেলে পড়ে তাঁকে আঘাত করে।
অনুষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। ফলে দুর্ঘটনার মুহূর্ত ও তার পরের মরিয়া পরিস্থিতি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ভিডিওতে গির্জাজুড়ে চিৎকার শোনা যায়; উপাসকেরা ছুটে যান যাজকের কাছে এবং সাহায্যের জন্য ডাকতে থাকেন। এক নারীর কণ্ঠে ‘ফাদার, ফাদার… অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন’—এমন আকুতিও শোনা গেছে ভিডিওতে।
গুয়াইয়াকিলের আর্চডায়োসিস ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে তাঁকে সেন্ট্রাল ভিকারিয়েটের অন্তর্গত পেরপেতুয়ো সোকোরো গির্জার প্যারিশ যাজক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়।
আর্চডায়োসিসের শোকবার্তায় স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয়, তাঁদের প্রিয় ফাদার প্যাট্রিসিও আলফ্রেদো সানচেজ মলিনারি ‘পিতার ঘরে’ চলে গেছেন, তাঁর উপস্থিতি ও মহিমা উপভোগের জন্য। বার্তার শেষাংশে লাতিন প্রার্থনায় তাঁর চিরশান্তি কামনা করা হয়—তিনি যেন চিরশান্তিতে বিশ্রাম নেন।
এই মৃত্যুকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে সময়ের কাকতাল। ইকুয়েডরের সংবাদমাধ্যম প্রিমিসিয়াস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার মাত্র একদিন আগেই আর্চডায়োসিস তাঁকে তাঁর যাজক হিসেবে অভিষেকের বার্ষিকীতে অভিনন্দন জানিয়েছিল। উৎসবের অভিনন্দনের পরদিনই এলো শোকের খবর।
ফাদার সানচেজ মলিনারি ছিলেন মোস্ট হোলি রিডিমার ধর্মসংঘের সদস্য, যারা রিডেম্পটরিস্ট নামে পরিচিত। গুয়াইয়াকিলে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি বেশ কয়েক বছর ইকুয়েডরের লস রিওস প্রদেশের ভিনসেস শহরের সান লরেঞ্জো গির্জার প্যারিশ যাজক ছিলেন বলে জানিয়েছে প্রিমিসিয়াস।
তাঁর সাবেক প্যারিশ সান লরেঞ্জোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এল উনিভেরসো পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ওই প্যারিশের মানুষ তাঁকে স্মরণ করেছেন তাঁর নিষ্ঠা ও যাজকীয় ভালোবাসার জন্য, যা তিনি সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে রেখে গেছেন।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। ক্রুশটি কেন হঠাৎ ভেঙে বা হেলে পড়ল, রোববার পর্যন্ত গির্জা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে দুর্ঘটনাটি নিছক যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি কাঠামোগত কোনো সমস্যা ছিল—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
একটি প্রার্থনাসভা, যা বিশ্বাসীদের কাছে শান্তি ও সান্ত্বনার মুহূর্ত, সেটিই পরিণত হলো এমন এক ট্র্যাজেডিতে, যার সাক্ষী হলেন সরাসরি সম্প্রচার দেখা অসংখ্য মানুষও। গির্জার ভেতরে উপস্থিতদের আতঙ্কিত চিৎকার আর ছুটোছুটির দৃশ্য এই ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আর্চডায়োসিসের আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা ও সাবেক প্যারিশের শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে তাঁকে বিদায় জানানোর প্রক্রিয়া। তাঁর শেষকৃত্য বা স্মরণসভা নিয়ে বিস্তারিত কর্মসূচি এখনো জানা যায়নি।
সব মিলিয়ে এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; গির্জার মতো উপাসনালয়ে নিরাপত্তা ও কাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ক্রুশ ভেঙে পড়ার কারণ অনুসন্ধান এবং কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ব্যাখ্যার দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন শোকাহত বিশ্বাসীরা।





