আশুলিয়ার জিরাবোতে বেতনে সংসার চলছে না পোশাকশ্রমিকদের: ‘দুই মাস হইছে, মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি’

ঢাকার আশুলিয়ার জিরাবো বাজারের পাশের ছোট একটি কলোনিতে দুই পাশে ২০টির মতো ছোট ছোট ঘর রয়েছে, যার সবগুলোতেই থাকেন ওই এলাকায় কর্মরত পোশাকশ্রমিকরা। কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মদিবস থাকলেও সকাল এগারোটার দিকে তাদের বসবাসের প্রায় প্রতিটি ঘরেই শ্রমিকদের উপস্থিতি দেখা গেছে, কারণ গত কয়েকদিন ধরে কারখানা থেকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ছুটি হয়ে যাচ্ছে।
সেই কলোনির ছোট একটি ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন পোশাকশ্রমিক টুটুল মোল্লা। প্রতিদিন সকালে কারখানায় গেলেও ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটি হয়ে বাসায় ফিরে আসছেন তিনি। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সব কিছুর দাম খালি বাড়তেছেই। যেই বেতন পাই তা দিয়ে দুই বেলা খাই, তারপরও অর্ধেক মাসও চলে না। দুই মাস হইছে মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি, গোস্ত খাওয়া হয় শুধু দুই ঈদে।’
কলোনির অন্তত ১০টি পোশাকশ্রমিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগ শ্রমিকের বক্তব্য একই: মাত্র এক বছরেই তাদের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ, কিন্তু তার বিপরীতে আয় বাড়েনি। শ্রমিকদের প্রায় সবার বক্তব্য, গত কয়েক মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম, যা তাদের খরচের হিসাব-নিকাশই বদলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা; এই বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে। গত কয়েকদিন ধরে সর্বনিম্ন বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবিতে আন্দোলন জোরালো হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে একটি মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
২০২৪ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে রহিমা খাতুন সাড়ে ১২ হাজার টাকায় একটি কারখানায় কাজ শুরু করেছিলেন। তখন তার স্বামীও আরেকটি কারখানায় চাকরি করতেন এবং দুজনের আয়ে পাঁচজনের সংসার মোটামুটি চলত। কয়েক মাস আগে স্বামী অসুস্থ হয়ে চাকরি হারানোর পর এখন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। তার ভাষ্য, ‘দুই বছরে আমার আয় দেড় হাজার টাকা বাড়ছে। আর সংসারের খরচ বাড়ছে সাত আট হাজার টাকা। এখন এই বেতন দিয়ে আমার সংসার চালাবো কিভাবে।’
কলোনির প্রতিটি বাসার ভাড়া পাঁচ হাজার দুইশো টাকা এবং ঘরগুলোতে থাকার জন্য ছোট ছোট দুইটি কক্ষ রয়েছে। সেখানকার একটি ঘরে থাকা পোশাকশ্রমিক মনোয়ারা বেগম জানান, তার মাসের আয় ১৫ হাজার টাকা, আর বাসা ভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের পেছনেই খরচ হয় প্রায় নয় হাজার টাকা; বাকি টাকা দিয়েই হিসাব করে সংসার চালাতে হয়। তার প্রশ্ন, ‘বাজারে এখন শুধু আলু আর কাঁচামরিচ বাদে বাকি সবকিছুর দাম বাড়ছে, আমরা সংসার চালাবো কিভাবে।’
কলোনিতে থাকা শ্রমিকদের বেশিরভাগই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নির্দিষ্ট দোকান থেকে বাকিতে কেনেন। পোশাকশ্রমিক মো. নুরুন্নবী মিয়া বলেন, ‘মাসের সাত তারিখে বেতন পাই, ১০ তারিখ দোকানের বাকি শোধ করি, বাসা ভাড়া দেই। ১৫ তারিখের পর আমাদের হাতে আর কোন টাকা থাকে না। খরচ এত বাড়ছে যে সংসার চালাইতে হিমশিম খাইতেছি।’
পটুয়াখালী থেকে কয়েক বছর আগে ঢাকায় আসা জেসমিন আক্তার ও তার ছেলে দুজনই পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন। বছরখানেক হলো তার চাকরি চলে যাওয়ার পর এখন সংসার চলছে ছেলের আয়ে; ছেলের বেতন ১৬ হাজার টাকা, মাঝে মাঝে ওভারটাইমে কিছু বাড়তি টাকা আসে। তিনি বলেন, আগে গ্যাসে রান্না করতেন, কিন্তু এখন ২৫০০ টাকার নিচে কোনো সিলিন্ডার পাওয়া যায় না বলে বাধ্য হয়ে গ্যাস কেনা বাদ দিয়ে চুলায় রান্না করেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মাত্র এক বছর আগে রান্নার ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ছিল ১২শ টাকার কিছু বেশি এবং তখন নির্ধারিত দামেই আশুলিয়ার দোকানগুলোতে সিলিন্ডার বিক্রি হতো। গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে তাদের প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকায়। রহিমা বেগম বলেন, ‘দুই বছরে আমার বেতন বাড়ছে মাত্র এক হাজার টাকা, আর শুধু গ্যাসের দামই বাড়ছে প্রায় দেড় হাজার টাকা।’
বিদ্যুৎ বিলের প্রসঙ্গে কলোনির শ্রমিকরা বলেন, এখানকার বেশিরভাগ ঘরে এক বছর আগে গড়ে বিদ্যুৎ বিল আসত সর্বোচ্চ ৫০০-৬০০ টাকা; এখন সেই বিল দাঁড়িয়েছে ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। নুরুন্নবী মিয়া বলেন, ‘আগে কারেন্ট বিল দিতাম ৫০০/৬০০ টাকা। এখন কোন মাসে দেড় হাজার, কোন মাসে দুই হাজার টাকা। এই গ্যাস আর বিদ্যুৎই আমাদের খরচ অনেক বাড়ায়ে দিছে।’
আশুলিয়া-জিরাবো এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পোশাক কারখানা রয়েছে; সকাল আটটায় শ্রমিকরা লাইন ধরে কারখানায় প্রবেশ করেন এবং বিকেলে ছুটি হলে বাসায় ফেরেন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই রুটিন বদলে গেছে: সকাল আটটায় কাজে গেলেও সবাই ফিরে আসছেন দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে। কলোনির প্রথম বাসায় পোশাকশ্রমিক আমিনুর রহমানকে প্লাস্টিক দিয়ে পাটি বুনতে দেখা গেছে; তিনি জানান, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলা আন্দোলনের কারণে কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে দুই ঘণ্টার মধ্যে, আর সেই সুযোগে তিনি পাটি বুনতে বসেন।
৩ নভেম্বর মঙ্গলবার আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে আগের কয়েকদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সকাল নয়টার পর বিভিন্ন কারখানায় অস্থিরতা শুরু হয়, এরপর সেদিনও কারখানাগুলো ছুটি দেওয়া হয়। ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠন করে বেতন বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার পর সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এই আন্দোলনের পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে।
তবে পোশাকশ্রমিকদের বক্তব্য, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতটাই বেড়েছে যে বেতন না বাড়লে জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। নুরুন্নবী মিয়া বলেন, ‘এই আন্দোলন তো আর এমনিতেই করতেছি না। আগে জিনিসপত্র কম দামে কিনতে পারতাম, সংসার চলতো। এখন তো চলে না। সব কিছুর দাম বাড়বে, আর আমাদের বেতন আগের মতো থাকবে, তাহলে আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কী উপায় আছে বলেন। সরকার সব কিছু দাম কমায়ে দিক, আমাদের বাড়তি বেতন লাগবে না।’



