মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার ঢেলেও ফল পেলেন না ইলন মাস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার খরচ করে রেকর্ড গড়েছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে সারা দেশে ডেমোক্র্যাটদের জয়জয়কারের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে, এই বিপুল খরচের বিনিময়ে তিনি প্রায় কিছুই পাচ্ছেন না।
স্পেসএক্স ও টেসলার প্রধান নির্বাহী মাস্ক নির্বাচনজুড়ে রিপাবলিকান-ঘেঁষা সুপার প্যাক ও বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অন্তত ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার (৪৪৬ মিলিয়ন) দিয়েছেন। বিশেষ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনে তিনি অর্থ ঢেলেছেন, যাতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ২০২৪ সালের প্রায় ২৯ কোটি ডলারের খরচের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছেন।
মাস্কের ‘আমেরিকা প্যাক’ যেসব পাঁচটি সিনেট আসনে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে, তার প্রতিটিতেই ডেমোক্র্যাটরা জিতেছেন।
টেক্সাসে মাস্কের সাম্রাজ্যের সদর দপ্তর অবস্থিত এবং সেখানেই তিনি রাজনৈতিক প্রচেষ্টার বড় অংশ ব্যয় করেছেন। অথচ টেক্সাসে রিপাবলিকানরা সিনেট আসন ও গভর্নরের পদ হারিয়েছে, এবং রাজ্যের নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাস্কের রাজনৈতিক অর্থ অন্তত আটটি রিপাবলিকান-ঘেঁষা সুপার প্যাকে গেছে, যারা সারা দেশের বিভিন্ন আসনে প্রচার চালিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুদান, অন্তত ২১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, গেছে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠা করা আমেরিকা প্যাকে। এ ছাড়া তিনি সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে দিয়েছেন ১৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যারা টেক্সাসের রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনসহ একাধিক প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে।
সবচেয়ে বেশি অর্থ ও মনোযোগ মাস্ক দিয়েছেন টেক্সাসের সিনেট লড়াইয়ে, যেখানে প্যাক্সটনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডেমোক্র্যাট জেমস ট্যালারিকো। শুধু ট্যালারিকোবিরোধী বিজ্ঞাপন ও প্রচারেই আমেরিকা প্যাক খরচ করেছে অন্তত ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মাস্ক নিজেও তাঁর সামাজিক মাধ্যম এক্সে বারবার ট্যালারিকোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পোস্ট দিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতে বড় ব্যবধানে জয়ের পর সিনেটর-নির্বাচিত ট্যালারিকো তাঁর বিজয় ভাষণে মাস্কের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করে দিলাম, পৃথিবীর সব অর্থও টেক্সাসের জনগণের সামনে কিছুই নয়। আমরা প্রতিটি বিলিয়নিয়ার বড় দাতা, প্রতিটি ট্রিলিয়নিয়ার বড় দাতার কাছে বার্তা পাঠিয়ে দিলাম।’
মিশিগান, মেইন, ওহাইও ও আইওয়ার সিনেট আসনগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। আমেরিকা প্যাক কোটি কোটি ডলার খরচ করে রিপাবলিকানদের সমর্থন করলেও এসব আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরাই জিতেছেন। প্যাকটির বিজ্ঞাপনে মূলত ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে আক্রমণ কিংবা ডেমোক্র্যাটদের ‘চরম সমাজতন্ত্রী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে মাস্ক এক্সে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ালেও নির্বাচনের রাতে তিনি অস্বাভাবিকভাবে চুপ ছিলেন। ‘মহাকাশে ডেটাসেন্টার এখন বেশ লোভনীয় মনে হচ্ছে’ — এমন একটি রসিকতামূলক পোস্ট ছাড়া রিপাবলিকানদের শীর্ষ এই দাতা ফলাফল নিয়ে প্রায় কিছুই বলেননি।
খরচ ব্যর্থ হলেও তার প্রভাব কম নয়। মাস্ক ও সংশ্লিষ্ট সুপার প্যাকগুলোর ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কয়েকটি নির্বাচনী লড়াই তৈরি হয়েছে, এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কত খরচ হতে পারে, তার একটি নজিরও তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতে অর্থ দিয়ে কতদূর কেনা যায়, তা নিয়ে আগামী মাসগুলোতে বিশ্লেষণ চলবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
মাস্কের কোম্পানিগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে লাভজনক চুক্তির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে, সেই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের নরম অবস্থানের সুবিধাও পেয়েছে। টেক্সাসে রাজ্যের আইনসভা ও গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট তাঁকে ব্যবসার জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ দিয়েছেন এবং তাঁর লবিস্টদের সমর্থিত আইনও পাস হয়েছে।
তবে টেক্সাসের আগত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা মাস্ক ও তাঁর ব্যবসার প্রতি আরও সমালোচনামূলক অবস্থান নিতে পারেন। তিনি ডেটাসেন্টারের ওপর স্থগিতাদেশের আহ্বান জানিয়েছেন এবং অ্যাবটের দপ্তর ও মাস্কের মধ্যে আদান-প্রদান করা ইমেইলের অনাবৃত অনুলিপি পেতে কয়েক মাস ধরে আইনি লড়াই করছেন। এদিকে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা গত বছর তথাকথিত ‘সরকারি দক্ষতা বিভাগ’-এর প্রধান থাকাকালীন মাস্কের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন এবং তাঁর কোম্পানিগুলোর কেন্দ্রীয় তহবিল খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।



