ইরান সংঘাতকে ‘নরম যুদ্ধ’ বললেন ট্রাম্প, ভোটের আগের রাতে বললেন চাইলেই শেষ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটের আগের রাতে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে তিনি এই সংঘাতকে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ নয়, বরং একটি ‘নরম যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই যেকোনো সময় শেষ করে দিতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা কোনো যুদ্ধ করছি না… আমরা শেষ কবে কিছুতে গুলি ছুড়েছি? এটা যুদ্ধ নয়, এটা খুবই নরম একটা যুদ্ধ।” মঙ্গলবারের নির্বাচনের দিনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি তার মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার অভিযান, দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরে প্রশাসনের সাফল্য এবং ইরান যুদ্ধ নিয়েই কথা বলেন।
ইরান ইস্যুটি নির্বাচনের দিনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। আট মাস আগে শুরু হওয়া এই সংঘাতের অর্থনৈতিক পরিণতি—বিশেষ করে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়া—নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে বলেই পরিস্থিতির এমন ব্যাখ্যা দিতে হলো প্রেসিডেন্টকে।
ট্রাম্প সঞ্চালক শন হ্যানিটিকে বলেন, “যুদ্ধ বলতে কী বোঝায়? যুদ্ধ মানে লড়াই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকান। শেষ কবে আমাদের তাদের সঙ্গে লড়াই করতে দেখেছেন? মাসের পর মাস কেটে যায়, আমরা কথা বলি।” তিনি আরও বলেন, “এটা তেমন কোনো যুদ্ধ নয়, শন, কারণ কয়েক মাস ধরে কোনো গোলাগুলিই হচ্ছে না।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে এর ঠিক পরপরই, যখন সোমবার হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন এক বিমানে ইরান গুলি চালানোর পর এই হামলা চালানো হয়। কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা ইরানে পূর্ণমাত্রার মার্কিন সামরিক হামলায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়।
প্রেসিডেন্ট সোমবার বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবার সামরিক হামলা শুরু করার কোনো তাড়া তার নেই। তবে সর্বশেষ দফার শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘কড়া আঘাত’ দেবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, “‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ দিয়ে আমরা তাদের সম্ভাব্য সব পারমাণবিক সক্ষমতা বোমা মেরে ধ্বংস করে দিয়েছি। এখন হয়তো পিকঅ্যাক্স (পর্বত) নিয়েও এগোতে হতে পারে, তবে সেটা বড় কোনো বিষয় নয়। আমরা আক্ষরিক অর্থেই এক ঘণ্টায় তা করে ফেলতে পারি।”
তিনি আরও বলেন, “এটা চলমান কোনো যুদ্ধের মতো নয়, কোনো যুদ্ধই চলছে না। তারা চুক্তি না করলে তা ঘটতে পারে। কিন্তু তারা চুক্তি করতে খুবই আগ্রহী, এবং চুক্তি হওয়ার খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।” অর্থাৎ তার ভাষায়, দরজা খোলা আছে আলোচনার জন্যই।
তবে যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে জনমনে সংশয় স্পষ্ট। ফক্স নিউজের এক জরিপ অনুযায়ী, ৭১ শতাংশ মানুষ মনে করেন ইরান যুদ্ধ শেষ করার কোনো পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের নেই। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাতের আর্থিক বোঝা রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক দায় হয়ে উঠেছে; পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে করদাতাদের খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বেশি।
এই বিপুল খরচের সমালোচনাকে অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। খরচটিকে তিনি ‘সামান্য’ বলে বর্ণনা করে বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে এই যুদ্ধ জরুরি ছিল।
ইরানের সামরিক অবস্থা নিয়েও তার দাবি ছিল বিস্তারিত। ট্রাম্প বলেন, “তাদের সেনাবাহিনী শেষ, নৌবাহিনী শেষ, বিমানবাহিনী শেষ, বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা শেষ। তাদের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তবে খুব বেশি নয়—নতুন করে তৈরির সক্ষমতাও খুব কম। ড্রোন আছে, তবে সেগুলোর সংখ্যাও খুব বেশি নয়, তৈরির সক্ষমতাও সামান্য।”
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বার্তা ছিল একটাই: যুক্তরাষ্ট্র ‘সম্পূর্ণ শক্তির’ অবস্থান থেকে লেনদেন করছে, আর এই সংঘাত ‘যেকোনো সময়’ শেষ করে দেওয়া তার হাতেই রয়েছে। ভোটের আগের রাতে এই আশ্বাস ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করে, তার জবাব মিলবে মঙ্গলবারের ফলাফলেই।

