ব্রিটেনে দোকান মূল্য মূল্যস্ফীতি আড়াই বছরের সর্বোচ্চে, অক্টোবরে ২.১ শতাংশ

ব্রিটেনে দোকানের পণ্যের দাম বাড়ার হার আড়াই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম (বিআরসি) জানিয়েছে, অক্টোবরে দোকান মূল্য মূল্যস্ফীতি বছরওয়ারি ২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, যা সেপ্টেম্বরের ১ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় বড় লাফ।
লবি গ্রুপটি সতর্ক করেছে, খুচরা বিক্রেতারা এতদিন ভোক্তাদের কাছ থেকে যে বিপুল খরচের চাপ আটকে রেখেছিলেন, সেই বাঁধ এবার ভাঙতে শুরু করেছে।
বিআরসির মতে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি ও খাদ্য উপকরণের বাড়তি খরচ এবার বিক্রেতারা ক্রেতাদের ওপর চাপাতে শুরু করেছেন, যা এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণ।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি গত এক বছর ধরে কম থাকলেও এই মাসে বেড়ে বছরওয়ারি ২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে; সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এর ফলে বুধবার তার প্রথম বাজেটের আগে অর্থমন্ত্রী জন হিলির ওপর চাপ আরও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পোশাক ও জুতাসহ খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, বছরওয়ারি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সম্প্রতি ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগের মাসগুলোতে গড় দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। গ্যাসের দামও তীব্রভাবে বেড়েছে, যার ধাক্কায় গত মাসে ব্রিটেনের ভোক্তা মূল্য সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশে ঠেকেছে।
এই মাসের আগ পর্যন্ত খুচরা বিক্রেতারা মূলত কাঁচামালের বাড়তি খরচ নিজেরাই শুষে নিয়েছিলেন, যার প্রধান কারণ ছিল ক্রেতাদের দুর্বল চাহিদা। জরিপে দেখা গেছে, গ্রীষ্মের পর থেকে ভোক্তা আস্থা তীব্রভাবে কমেছে, যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। খুচরা মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের নয় সদস্যের মুদ্রানীতি কমিটির অনেকেই ডিসেম্বর বা নতুন বছরে হার আরও বাড়ানোর পক্ষে যেতে পারেন।
বিআরসির প্রধান নির্বাহী হেলেন ডিকিনসন বলেছেন, গত দুই বছরে খুচরা বিক্রেতারা যে বিপুল খরচ শুষে নিয়েছেন, সেই বাঁধ এবার ভাঙতে শুরু করেছে। তিনি বলেছেন, হ্যালোইন উদ্যাপনের আগে ক্রেতা টানতে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হলেও সুপারমার্কেটগুলো আর তাকের টিনজাত ও প্যাকেটজাত পণ্যের দাম বাড়া ঠেকাতে পারছে না।
জীবনযাত্রার খরচের চাপ অর্থমন্ত্রীর নিজ দলের পেছনের সারির সংসদ সদস্যদের কাছ থেকেও তীব্র চাপ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যারা উদ্বিগ্ন যে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের নির্বাচনী এলাকার অনেক মানুষের ক্ষতি করছে।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর জীবনযাত্রার খরচের প্রভাব নিয়ে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও জননীতি বিষয়ের অধ্যাপক রুথ প্যাট্রিক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি এই গবেষণায় দেখা গেছে, পেট্রোল ও ডিজেলের উচ্চ দাম সেই পরিবারগুলোকে আঘাত করছে, যাদের প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুল ও চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করতে হয় এবং যারা কাজে যাতায়াতে গাড়ি ব্যবহার করেন।
প্যাট্রিকের নেতৃত্বে 'চেঞ্জিং রিয়েলিটিজ' নামের অনলাইন প্রকল্পটি ১০০টি নিম্ন আয়ের পরিবারকে অনুসরণ করছে। প্রকল্প অনুযায়ী, অনেক জায়গায় পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১ পাউন্ড ৭৫ পেন্সের বেশি এবং ডিজেল প্রায়ই লিটারপ্রতি ২ পাউন্ডের বেশি হওয়ায় অনেকের জন্য কাজ করাটাই লাভজনক থাকছে না। গত মাসে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ, ৭৩ শতাংশ, ছাড়ের পণ্যের তাক থেকে কেনাকাটা করেছেন; ৬২ শতাংশ কেনা খাবারের ধরন বদলেছেন এবং ৬৩ শতাংশ ঠান্ডা লাগলেও হিটিং বন্ধ রেখেছেন।
গবেষণায় ৭০ জন অংশগ্রহণকারীর গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৭ জন গত মাসে খরচ কমাতে নেওয়া কৌশলগুলো জানিয়েছেন। স্কটল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী অংশগ্রহণকারী রোজি এল বলেছেন, এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা গাড়ি চালানো চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা তিনি জানেন না। তিনি বলেছেন, যেখানে তারা থাকেন সেখানে গণপরিবহন সহজলভ্য বা নির্ভরযোগ্য নয় এবং গাড়ি না থাকলে তাদের জীবনের প্রতিটি দিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে তার সন্তানরা প্রতিবন্ধী বলে।
প্যাট্রিক বলেছেন, সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো এ পর্যন্ত যে সহায়তা দিয়েছে, তা সমস্যার মাত্রার সঙ্গে মেলে না।




