মন্ট্রিয়ল সম্মেলনে মুখোমুখি দুই রূপরেখা: কার্নির মধ্যশক্তি জোট বনাম ভন ডার লেয়েনের ব্রাসেলসকেন্দ্রিক ব্লক

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন এই সপ্তাহে মন্ট্রিয়লে এক সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন, যেখানে আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্পর্কের নতুন পথ নির্ধারণের কথা। দুজনই দেখাতে চান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে বদলে যাওয়া বিশ্বে তারা টিকে থাকতে পারেন; তবে তাদের এই নতুন জোট নিয়ে দুজনের ধারণা আলাদা, আর রাজনৈতিক প্রতিরোধ অংশীদারত্ব কত দূর যাবে, তা সীমিত করে দিতে পারে।
কার্নি চান মধ্যশক্তিগুলোর একটি বৈশ্বিক জোট গড়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে সাহায্য করতে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করবে। তবে তার এই রূপরেখা নির্ভর করছে ইউরোপের সঙ্গে নতুন এক সম্পর্কের ওপর, অথচ ইউরোপ নিজেকে মোটেই মধ্যশক্তি হিসেবে দেখে না।
ভন ডার লেয়েনের রূপরেখা ভিন্ন: ব্রাসেলসকেন্দ্রিক একটি ব্লক, যা কানাডা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়াবে। জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় আইনপ্রণেতা সিগফ্রিড মুরেশানের ভাষায়, এর উদ্দেশ্য ইইউর জন্য উদার গণতন্ত্রগুলোর ‘বৈশ্বিক মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র’ হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা।
ভন ডার লেয়েনের ইইউতে ‘সহযোগী সদস্যপদ’ দেওয়ার প্রস্তাব আটলান্টিকের দুই পাড়ের কর্মকর্তাদেরই অবাক করেছে। চারজন কূটনীতিক জানিয়েছেন, স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি ধারণাটি তোলার আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, এই নামটি তারা বোঝেন না এবং এটি এখনো সংজ্ঞায়িত হয়নি। এরপর থেকে জার্মানি এই পরিকল্পনার বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।
একজন কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ঘোড়ার আগে গাড়ি জুতে দিয়েছি। আমরা কিছু ঘোষণা করছি, তারপর সেটিকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
ট্রাম্প সদস্যপদের এই ধারণাকে ‘হাস্যকর’ বলেছেন, তবে এটি বাস্তবায়িত হলে ‘খুব গুরুতর শুল্ক’ আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।
ইইউতে কানাডার রাষ্ট্রদূত জোনাথন উইলকিনসন গত মাসে বলেন, আগেভাগে প্রকাশ হয়ে যাওয়া একটি নাম নিয়ে মানুষ বেশি মাথা ঘামিয়েছে। স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে ভাষণে কার্নি কানাডা-ইইউ সম্পর্ককে ‘ভবিষ্যতের জোট’ বলে অভিহিত করেন। উইলকিনসন বলেন, কানাডা-ইইউ প্রকল্প অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে দেখাবে কীভাবে অংশীদারত্ব গভীর করা যায়, এবং এটি ডাভোসে কার্নির বলা কথার সঙ্গেই যুক্ত।
মন্ট্রিয়লে কার্নি, ভন ডার লেয়েন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তার হাতে দুই দিন সময় রয়েছে পরের ধাপ নির্ধারণের জন্য। নেতাদের ওপর চাপ রয়েছে, যেন তারা শুধু উদার গণতন্ত্রের ছবি তুলে সম্মেলন শেষ না করেন; প্রথমত তাদের ঠিক করতে হবে ‘সহযোগী সদস্যপদ’ বলতে কী বোঝায়, এবং ভন ডার লেয়েনের পরিকল্পনায় হতভম্ব ইইউ রাজধানীগুলোর প্রতিরোধ সামলাতে হবে।
অটোয়া ইইউকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাণিজ্য বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগে স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে দেখে। দুই পক্ষের মধ্যে ইতিমধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, যা দুই পক্ষই কম ব্যবহৃত বলে মনে করে। এই সপ্তাহে মন্ট্রিয়লে জড়ো হওয়া নেতারা কানাডা-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি সেটার ১০ম বার্ষিকী উদ্যাপন করবেন। তবে ইইউর নয়টি সদস্য দেশ এখনো চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। চুক্তিটি ২০১৭ সাল থেকে সাময়িকভাবে কার্যকর রয়েছে।
কানাডার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী মণিন্দর সিধু গত সপ্তাহে ডাবলিনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের অভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, আর অভিন্ন সুযোগ রয়েছে আরও অনেক বেশি। কানাডা ইউরোপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে চায়।’ তিনি জানান, ইইউ সদস্য দেশগুলোতে সেটা চুক্তির ব্যবহারের হার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
দুই পক্ষের বাণিজ্য আলোচনায় অভিযোগের লম্বা তালিকাও রয়েছে। গত অক্টোবরে ব্রাসেলস-অটোয়া বৈঠকে ইইউ অভিযোগ করে, কানাডার কিছু কর ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চাপ ফেলে, পনির আমদানির কোটা অস্বচ্ছ, প্রসাধনীর নিয়ম জটিল এবং ইউরোপীয় ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর প্রাদেশিক কর ও মার্কআপ বৈষম্যমূলক। অন্যদিকে কানাডা সতর্ক করে, ইইউর বন উজাড়সংক্রান্ত নিয়ম তার রপ্তানিকারকদের ওপর বোঝা চাপাতে পারে, ব্রাসেলসের কার্বন সীমান্ত করের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কানাডীয় মানের স্বীকৃতি বাড়ানোর দাবি জানায়।
শিল্পনীতি নিয়েও টানাপোড়েন রয়েছে। ব্রাসেলসের উদ্বেগ কার্নির ‘বাই কানাডিয়ান’ উদ্যোগ এবং ইইউ-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে। অন্যদিকে কানাডা নিশ্চিত নয়, তার কোম্পানিগুলো ইইউর প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ পছন্দনীতির জন্য যোগ্য হবে কি না, যার মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ের ব্যয় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর দিকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বস্ত বাণিজ্য অংশীদারদের ক্ষেত্রে এই পছন্দ প্রসারিত করা হবে কি না, তা নিয়ে ইইউ বিভক্ত, এবং বিষয়টি মন্ট্রিয়লে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কানাডা ইইউ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মার্ক ক্যামিলেরি বলেন, সম্পর্ক আরও গভীর করতে হলে ছাড় দিতে হবে। ১০ বছর বয়সী সেটা চুক্তিকে তিনি আগাছায় ভরা বাগানের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, কানাডীয় ও ইউরোপীয় পছন্দনীতির কারণে বাজারে প্রবেশ ক্ষয় হতে দেখা তার জন্য বেদনাদায়ক।
সম্ভাব্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে একটি নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি। মার্চে শুরু হওয়া আলোচনা গত সপ্তাহেও চলছিল। তবে চুক্তিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিস্তারিত পাঠ্য নেই, ফলে দুই পক্ষকে অন্যত্র সহযোগিতার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে, সম্ভবত ইইউর প্রস্তাবিত ক্লাউড ও এআই উন্নয়ন আইনের মাধ্যমে। ইউরোপীয় কমিশন কানাডাকে শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি ইরাসমাস প্লাসে যোগ দেওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে বলে একজন ইইউ কর্মকর্তা জানিয়েছেন; কার্নি ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ইইউ কানাডাকে ইউক্রেনের জন্য তহবিল বাড়ানোর চাপ দিচ্ছে।




