ফ্রান্সে বিক্ষোভে ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ সব বিক্ষোভকারীর ওপর চাপানোর বিলে প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে ট্রেড ইউনিয়নগুলো। সরকার দ্রুতগতিতে একটি বিল এগিয়ে নিচ্ছে, যাতে রাস্তার বিক্ষোভে ভাঙচুরের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবেন বিক্ষোভকারীরা, এমনকি তাঁরা নিজে সরাসরি সেই ক্ষতি না করলেও।
আগামী বসন্তে দায়িত্ব ছাড়তে যাওয়া ম্যাক্রোঁ এক মাসের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভের মুখে রয়েছেন। শিক্ষক অনুপস্থিতির জবাব, জরাজীর্ণ ভবনের মেরামত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তনের দাবিতে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কুল অবরোধ করেছে।
ট্রেড ইউনিয়ন এবং ‘জিলে জোন’ বা হলুদ জ্যাকেট সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা এখন টানা রাস্তার বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছে। স্কুলের পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচ ও সরকারি সেবা নিয়েও সামাজিক সংকট বাড়ছে। এই মাসের শুরুতে ফ্রান্সে কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার দিনের পর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়িয়েছে এবং বিক্ষোভে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে; মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে লুটপাট, আগুন এবং সরকারি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল।
এই সপ্তাহে সিনেটে সরকারের প্রস্তাবিত ‘ভ্যান্ডালস পে’ বা ‘ভাঙচুরকারীরাই দেবে’ আইন নিয়ে বিতর্ক হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো বিক্ষোভকারী ভাঙচুরের ক্ষতির জন্য ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত দিতে বাধ্য হতে পারেন, এমনকি তিনি নিজে সেই ক্ষতি না করলেও, যদি তিনি কাছাকাছি বিক্ষোভ চালিয়ে যান বা অপরাধীদের একই দলের অংশ হন। বিলে বিক্ষোভের ওপর ড্রোনের ব্যবহার বাড়ানোর বিধানও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেছেন, বিলটি ‘একান্ত প্রয়োজনীয়’। এটি মূলত তৈরি হয়েছিল মে মাসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে প্যারিস সাঁ-জেরমাঁর জয়ের পর সহিংস সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোতে লুটপাট ও আগুনের ঘটনার পরও তিনি বিলটির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অতি-ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির (আরএন) নেত্রী মারিন ল্য পেন আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে নিজের আইনশৃঙ্খলার অবস্থান জোরদার করছেন। আরএন দাবি করেছে, ‘ভ্যান্ডালস পে’ বিলটি মূলত তাদেরই ধারণা ছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তহবিল আত্মসাতের দণ্ডের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা ল্য পেন রোববার অরলেয়াঁয় সমাবেশে তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু করে ‘ফ্রান্সে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার’ প্রতিশ্রুতি দেন। ৮ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশে তিনি বলেন, ভাঙচুরকারীরা ক্ষতিপূরণ দেবে, সারা জীবন লাগলেও দেবে, এবং তাঁরা আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।
জঁ-লুক মেলশোঁর কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস আনসুমিসের এরিক ককরেল রোববার বলেন, এই আইন ফ্রান্সে রাস্তার বিক্ষোভের সমাপ্তি ঘটাবে, কারণ মানুষ অন্যের করা ভাঙচুরের জন্য ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইবে না। কমিউনিস্ট সিনেটর ফাবিয়াঁ গে পাবলিক সেনা টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, দেশে আর কোনো বিক্ষোভই হতে পারবে না।
লে মঁদ পত্রিকায় প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলো ও ফ্রান্সের হিউম্যান রাইটস লিগ লিখেছে, এই অন্যায্য আইন বিক্ষোভের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আক্রমণ; এটি পরিত্যাগ করা উচিত, নইলে আইনের শাসনের জন্য বড় ধরনের পশ্চাদপসরণের ঝুঁকি রয়েছে।
এই সপ্তাহান্তের বিক্ষোভগুলোতে ম্যাক্রোঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। সরকার যেসব অ-ইউনিয়ন বিক্ষোভকে ‘অবৈধ’ মনে করেছে সেগুলো নিষিদ্ধ করা এবং সব বিক্ষোভকারীকে শহরকেন্দ্র থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা।
ম্যাক্রোঁ জরুরি অবস্থা জারি না করলেও সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে সীমাবদ্ধতা এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলের সামনে জমায়েত ও শহরকেন্দ্রে বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা, কিছু জায়গায় কারফিউ এবং রেকর্ডসংখ্যক গ্রেপ্তার ব্যক্তির জন্য পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানো।
গ্রেনোবল আল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক আইনের অধ্যাপক সার্জ স্লামা তেলেরামা ম্যাগাজিনকে বলেন, ম্যাক্রোঁ জরুরি অবস্থা বাতিল করলেও বিভিন্ন ডিক্রির মাধ্যমে জনস্বাধীনতায় ব্যাপক বিধিনিষেধ আনা হয়েছে, যা নজিরবিহীন। তাঁর মতে, আগামী বছর অতি-ডানপন্থীরা নির্বাচনে জিতলে এই বিধানগুলো ব্যবহার করে আইন না বদলেই আরও দমনপীড়ন চালাতে পারবে।
স্কুল অবরোধ এড়াতে বিক্ষোভকারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সোমবার বৈঠক করবেন লেকর্নু। অর্থায়ন ও স্কুল মেরামতসহ তাদের দাবির জবাব দিতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।




