টানা ছুটিতে সিলেটে পর্যটকের ঢল: হোটেলে কক্ষ না পেয়ে মাজারে আশ্রয়, ব্যবসায়ীদের চোখে শত কোটি টাকার বাণিজ্য
দুর্গাপূজা ও টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের ঢল নেমেছে সিলেটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সিলেট ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। তবে আবাসনসংকটে পড়ে হোটেলে কক্ষ না পাওয়া শত শত পর্যটককে বিপাকে পড়তে হয়েছে; কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে।
ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখাল ও চা-বাগানগুলোতে উপচে পড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য, আর পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেখছেন শত কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা।
এবার দুর্গাপূজার ছুটির তালিকায় ছিল পাঁচ দিন। ছুটির আগে ও পরে দুই শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আরও চার দিন ছুটি কাটানোর সুযোগ পান। এর সঙ্গে ২৫ অক্টোবর রোববার লক্ষ্মীপূজা যুক্ত হওয়ায় সব মিলিয়ে ক্যালেন্ডারের হিসাবে টানা ১০ দিনের ছুটিকে ঘিরে সিলেটের পর্যটন খাতে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাহিদা।
ছুটির দিনে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে গিয়ে দেখা যায়, ধলাই নদীর তীরবর্তী এলাকায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ বড় বড় পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার স্বচ্ছ জলের স্রোতে সময় কাটাচ্ছেন। পান্থুমাই ঝরনা, উৎমাছড়া ও চা-বাগানের সবুজ অরণ্যও টানছে পর্যটকদের।
শুধু সিলেট নয়, পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও। চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ, লাউয়াছড়ার গভীর অরণ্য, মাধবপুর লেক ও মাধবকুণ্ড ঝরনায় ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলের রিসোর্টগুলোতেও দেখা গেছে পর্যটকদের বাড়তি চাপ, আর এতে পরিবহন, খাবারের দোকান ও স্থানীয় সেবামূলক ব্যবসায় ফিরেছে গতি।
আগে থেকে বুকিং থাকায় অনেক হোটেল-মোটেলে কক্ষ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কক্ষ মিললেও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসে পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন ভ্রমণকারীরা।
নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে সিলেটে বেড়াতে আসা আশরাফুল আলম বলেন, দীর্ঘ ছুটি উপভোগ করতে তিনি সিলেটের চা-বাগান, জাফলং, রাতারগুল ও সাদাপাথর ঘুরে দেখেছেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও আবাসন ও যাতায়াতে বাড়তি খরচ নিয়ে অসন্তুষ্ট তিনি। তাঁর ভাষায়, 'এবার হোটেলের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ গুনতে হয়েছে। আগে থেকে বুকিং করে এলে হয়তো এমনটা হতো না। তা ছাড়া মাজারকেন্দ্রিক সিএনজি ভাড়া বেশি, চালকদের আচরণও ভালো না। বাকি সব ঠিক আছে।'
পুরান ঢাকা থেকে আসা আলাউদ্দিন ব্যাপারি জানান, বিভিন্ন হোটেলে খোঁজ করেও কক্ষ পাননি; কোথাও কক্ষ পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়ার ক্ষেত্রেও একধরনের সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে এবং পর্যটকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীও জানিয়েছেন, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার থেকে পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য চালকেরা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ভাড়া চাইছেন।
হোটেলে কক্ষ না পেয়ে মাজার প্রাঙ্গণে রাত কাটানোর পরিস্থিতিতে পড়েন গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক শেখ ফারুক হাসান। তিনি বলেন, এমন আবাসনসংকটে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবেননি; কোথাও হোটেল না পেয়ে মাজারেই রাত কাটাতে হচ্ছে। পরদিনও কক্ষ না পেলে গাজীপুরে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।
পর্যটকদের ভোগান্তি শুধু আবাসন ও ভাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ছয় লেনের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে; সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। জাফলং যাওয়ার প্রায় ৫৫ কিলোমিটার সড়কের বেশির ভাগ জায়গায় রয়েছে বড় বড় খানাখন্দ; বিছানাকান্দির পথে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কের অবস্থাও বেহাল, আর লালাখালের মূল পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছাতে সারিঘাটের পর কাদামাটির সড়ক পাড়ি দিতে হয়।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের আগমনের প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শেখ রামিম আহমদ জানান, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের সব কটি কক্ষ বুকিং রয়েছে; গত দুই ঈদে ব্যবসায় মন্দা থাকলেও পূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে এবং রেস্তোরাঁয়ও বেড়েছে বেচাকেনা। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরের ঈদ ও পূজার ছুটির তুলনায় এবার ব্যবসা ভালো হচ্ছে।
ব্যবসায়ী নেতা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, 'পর্যটকদের আগমনে বাড়তি লাভের পাশাপাশি সিলেটের অর্থনীতি আরও চাঙা হয়েছে। পূজাসহ সরকারি টানা ১০ দিনের ছুটিতে সিলেটের পর্যটন খাতে অন্তত শত কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে।' সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক এজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এবার পূজায় ব্যবসা ভালো হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভালো ছিল; পর্যটকেরা সিলেটে এসে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পেরেছেন এবং এ নিয়ে কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশের সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহিনুর ইসলাম জানান, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণের পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি স্পটে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং যানজট কমাতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে তা যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


