কানসাসে ট্রাম্পের সমাবেশের একদিন: দুই মাইল লাইন, ভেতরে-বাইরে বিক্ষোভ আর ভোটের আহ্বান
পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর দেশ আমেরিকার ৪৫ ও ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাচনী সমাবেশে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে উইচিতা শহরের পাশে পার্কসিটির হার্টল্যান্ড ক্রেডিট ইউনিয়ন অ্যারেনায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশের বাইরে আকাশে প্লেন ও ড্রোনের চক্কর, ঘোড়ায় চড়া স্পেশাল পুলিশসহ নানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় পুরো এলাকা মোড়ানো ছিল।
সমাবেশে অংশ নিতে অনলাইনে আগে থেকেই রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক বেলা আড়াইটায়, তখন সমাবেশের দরজা খুলে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ দুই মাইল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে হাজারো কর্মী-সমর্থককে সমাবেশ প্রাঙ্গণে প্রবেশের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এই দীর্ঘ লাইনে হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র এশিয়ান মুখ চোখে পড়ে।
বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে ভেতরে ঢুকতে পারেননি। স্থানসংকুলান না হওয়ায় অ্যারেনার বাইরে হাজার হাজার মানুষকে ডিজিটাল স্ক্রিনে বক্তব্য শুনতে দেখা যায়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। প্রতিদিন কোনো না কোনো সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। কানসাসের রিপাবলিকান ভোটারদের উজ্জীবিত করতে এবং সিনেটর রজার মার্শালের সমর্থনে গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) তিনি পার্কসিটির হার্টল্যান্ড ক্রেডিট ইউনিয়ন অ্যারেনায় ভাষণ দেন।
প্রায় ৪৫ মিনিটের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বন্ধসহ অভিবাসী বিতাড়ন, কমিউনিস্ট-ঘৃণা, র্যাডিক্যাল ইসলামসহ নানা বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে ইমিগ্র্যান্টদের দায়ী করেন এবং আমেরিকান ভোটারদের সতর্ক করে দেন। বক্তব্যের শুরুতে সামনের সারিতে থাকা তাঁর অপছন্দের সংবাদমাধ্যমগুলোকে তিনি ‘ফেক নিউজ’ বলে অভিহিত করেন।
সমাবেশস্থলের বাইরে শতাধিক বিক্ষোভকারী নানা স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের প্ল্যাকার্ডে ট্রাম্পের প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা সাধারণ ভোটাররা ভালোভাবে নিচ্ছেন না।
সম্প্রতি ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, রেকর্ডসংখ্যক ৮৯ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন সরকারে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বিদ্যমান—যা ২০০৬ সাল থেকে ৩০ পয়েন্ট বেশি। এর জন্য ট্রাম্পকেই প্রধানত দায়ী করা হয়; অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মনে করেন, তিনি দেশ ও সাধারণ আমেরিকানদের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেন। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় তিনি অবৈধ বা অনৈতিক কিছু করেছেন।
বক্তব্যের মাঝখানে সমাবেশস্থলের ভেতরেও কিছু লোক ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া শুরু করলে তাঁকে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা যায়। তিনি তাঁদের ‘পেইড প্রোটেস্টর’ বা ভাড়া করা বিক্ষোভকারী বলে আখ্যায়িত করেন এবং পুলিশ তাঁদের বাইরে নিয়ে যায়। এ সময় ট্রাম্প মন্তব্য করেন, কাল পত্রিকার হেডলাইন দেখবেন—‘ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের সমাবেশ!’
যুগ যুগ ধরে রিপাবলিকান রাজ্য হিসেবে খ্যাত কানসাসের নির্বাচনী ফলাফল এবারও তাদের ঘরে আসবে বলে তাঁর দৃঢ় ধারণা। বক্তব্যে তিনি ভোটারদের ভোট নিশ্চিত করতে সবাইকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
পরিশেষে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে ভোট দিয়ে কানসাসকে আরও সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে ছোট-বড় অনেক সমাবেশ দেখলেও লেখকের অভিজ্ঞতায় এই সমাবেশ ছিল ব্যতিক্রম—মানুষের কথা বলার ও প্রতিবাদের স্বাধীনতা দেখে মনে হয়েছে, গণতন্ত্র এখনো বেঁচে আছে।






