ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বদলাচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান: ইসরায়েল, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার থেকে অভিবাসন—সবখানেই নতুন হিসাব
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা দুই বছর আগে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে বড় ধাক্কা দিয়েছিলেন। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলটির অনেক প্রার্থীই আলোচিত নানা ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবছেন।
কেউ ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের প্রশ্নে অবস্থান নরম করেছেন, কেউ আবার গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছেন আগের চেয়ে বেশি। কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর ডেমোক্র্যাটরা ভোটারদের মনোভাবের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন—কোথাও কোথাও দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি মতভেদেও যাচ্ছেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে চাওয়া ডলটির ভেতরে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত ও মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতারা প্রগতিশীল জনতাবাদের উত্থান ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর ভোটাররা চাইছেন আরও শক্তিশালী নীতি। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার মতো সংগঠনের পেছনে থাকা এই আন্দোলন প্রার্থীদের অবস্থানে এলাকাভেদে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বদল এসেছে ইসরায়েল প্রশ্নে। হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ শুরু করে, এতে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এ বছরের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে; ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ৮০ শতাংশ।
এই মনোভাব বদলের প্রভাব পড়েছে দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-সমর্থক ডেমোক্র্যাটদের ওপরও। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে যিনি পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন, সেই সিনেটর ক্রিস কুনস এ মাসে পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের 'পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্মূল্যায়নের' কথা বলেছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
পরিস্থিতির বদল বোঝা যায় আরেকটি তথ্যেও। এ বছরের শুরুতে ৪০ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইসরায়েলের কাছে প্রস্তাবিত সামরিক বিক্রির বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন; মাত্র সাতজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিপাবলিকানদের সঙ্গে গিয়ে তা আটকাতে ভোট দেন। ২০২৪ সালে শিকাগোতে দলীয় সম্মেলনে কমলা হ্যারিস ফিলিস্তিনি-আমেরিকান বক্তাকে মঞ্চ দেওয়ার দাবি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন—সেই সময় থেকে দলের সুর এখন অনেকটাই বদলেছে।
তবে দলীয় নেতৃত্বের একাংশ এখনো সতর্ক। সিনেটে সংখ্যালঘু দলনেতা চাক শুমার, যিনি ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ফিরে পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলনেতা হতে পারেন, বলেছেন ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার 'লৌহকঠিন' থাকতেই হবে। নতুন কংগ্রেসে প্রগতিশীল কণ্ঠ বাড়লে এই টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হতে পারে।
ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের প্রশ্নে ছবিটা উল্টো দিকে গেছে। স্কুল খেলায় ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনগুলোতে অনেক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সমর্থন কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা সরাসরি বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন। ওহাইওতে প্রতিনিধি মার্সি ক্যাপ্টুর বিজ্ঞাপনে বলেছেন, 'ছেলেদের মেয়েদের খেলায় খেলা উচিত নয়।' নর্থ ক্যারোলিনার প্রতিনিধি ডন ডেভিসের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খেলায় নারী ও মেয়েদের জন্য 'নিরাপদ ও ন্যায্য জায়গা' সবসময় থাকা উচিত। সাউথ ক্যারোলিনায় সিনেট প্রার্থী ও চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ নতুন বিজ্ঞাপনে নারীদের খেলায় 'জৈবিক পুরুষদের' অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন।
এই বদলের পেছনে ২০২৪ সালের বিখ্যাত রিপাবলিকান বিজ্ঞাপনের প্রভাবকে বড় করে দেখা হয়, যেখানে হ্যারিসের ট্রান্সজেন্ডার আমেরিকানদের প্রতি সমর্থনকে কটাক্ষ করা হয়েছিল—'কমলা তাদের/সবার জন্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনার জন্য' ছিল সেই বিজ্ঞাপনের বক্তব্য।
কিন্তু দলের সব জায়গায় এই পিছু হটা ঘটছে না। বৃহস্পতিবার মেইনের পোর্টল্যান্ডে এক টাউন হলে এক ট্রান্সজেন্ডার কলেজ শিক্ষার্থী ডেমোক্র্যাটদের কাছে 'পরিত্যক্ত' বোধ করার কথা বললে প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ বলেন, যারা এমন করছেন 'তারা ভুল করছেন'। তিনি বলেন, 'আমেরিকায় একজন ট্রান্স ব্যক্তির অধিকারে আপস করলেই প্রতিটি নাগরিকের অধিকারে আপস করা হয়।'
অভিবাসন প্রশ্নেও দলের ভেতরে দুই ধরনের সুর। জো বাইডেনের আমলে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন ৮০ লাখের বেশি মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করে, যা ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। টেক্সাসের আলোচিত সিনেট লড়াইয়ে প্রার্থী জেমস তালারিকো নিজেকে 'সীমান্ত নিরাপত্তা ডেমোক্র্যাট' হিসেবে হাজির করে শক্তিশালী সীমান্ত প্রয়োগ ও ব্যাপক অভিবাসন সংস্কারের পক্ষে কথা বলছেন।
মধ্যপন্থী নীতি নিয়ে কাজ করা সংগঠন থার্ড ওয়ের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা লুকাস হল্টজ আল জাজিরাকে বলেছেন, তালারিকোর মতো অবস্থান ভোটারদের কাছে ভালো সাড়া পাচ্ছে, কারণ তা প্রতিক্রিয়াশীল নয়, আগাম। তিনি বলেন, হ্যারিস ২০২৪ সালের সম্মেলনে সীমান্তে শৃঙ্খলার কথা বললেও পরে প্রচারণা সেই অবস্থানে অটল থাকেনি, ফলে বেশি ভোটার মনে করেছেন তিনি অতিমাত্রায় বামঘেঁষা।
অন্যদিকে প্রগতিশীলদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতিক্রিয়ায় বাম দিকে ঝোঁক আরও বেড়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টদের গুলিতে মার্কিন নাগরিক রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেত্তি নিহত হওয়ার মতো ঘটনার পর অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিই বিলোপ কিংবা বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জোর পেয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্নে অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের সব ধারাই একমত যে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়াতে হবে। মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের মতো প্রগতিশীলরা 'মেডিকেয়ার ফর অল'-এর পক্ষে, যেখানে সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে অ্যান্ড্রুজের মতো প্রার্থীরা মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্য আইনের ভর্তুকি ফেরানো আর বীমা কোম্পানির মুনাফা সীমিত করার কথা বলছেন। স্বাধীন স্বাস্থ্য সংস্থা কেএফএফের জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক এখন 'মেডিকেয়ার ফর অল' সমর্থন করেন—২০২০ সালের অক্টোবরের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট বেশি।
হল্টজের ভাষায়, প্রত্যেকের নিজস্ব পদ্ধতি থাকলেও মোটের ওপর সব ডেমোক্র্যাটই সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে যেতে চান, আর এ বিষয়ে সবাই একমত যে ট্রাম্প প্রশাসনের চেয়ে ভালো করতে হবে। মিডটার্মের ফলই বলে দেবে এই অবস্থান বদলের জুয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য কতটা কাজে এলো।





