রান-অফের আগের দিন কোপাকাবানায় লুলার পক্ষে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ, রোববার ভোটে মুখোমুখি ফ্লাভিও বলসোনারো
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রান-অফের আগের দিন শনিবার রিওর বিখ্যাত কোপাকাবানা সৈকতে জড়ো হয়েছেন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার হাজার হাজার সমর্থক। তাঁদের আশা, এই বিশাল সমাবেশ লুলাকে তাঁর কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের জয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
রোববারের রান-অফে ভোট দেবেন প্রায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ব্রাজিলীয়। ৪ অক্টোবরের প্রথম পর্বে বলসোনারো ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন, লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ। এখন জরিপে দুজন প্রায় সমানে সমান।
শনিবার প্রখর রোদের মধ্যে লাল পোশাক পরা জনতা আড়াই মাইল দীর্ঘ কোপাকাবানা সৈকত ভরিয়ে তোলেন। ১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফেরার পর থেকে প্রথম পর্বে হেরে যাওয়া কোনো প্রার্থী কখনো এভাবে ফিরে এসে জিততে পারেননি — লুলা সেই অভূতপূর্ব প্রত্যাবর্তনেরই চেষ্টা করছেন।
৬১ বছর বয়সী ট্রাকচালক জোসিয়াস সিলভা আস্থা প্রকাশ করে বলেন, তাঁর ৮০ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট চতুর্থ (অ-ধারাবাহিক) মেয়াদে জিতবেন। উৎসবের আমেজের এই মিছিলে তিনি ঘরে তৈরি একটি ফেস্টুন বহন করছিলেন, যাতে লেখা ছিল — ‘লুলা আবার নির্বাচিত। আগামীকাল হবে নতুন দিন।’
সিলভা বলেন, ‘মানুষ জেগে উঠেছে।’ লুলার প্রথম পর্বের পরাজয়ের পর থেকে ব্রাজিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বড় বড় সড়ক বিক্ষোভের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এর অনেকগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন শিক্ষার্থীরা।
তিনি আরও বলেন, ‘তরুণেরা জানে, আমাদের এই জয় দরকার, নইলে আবার একনায়কতন্ত্র আসবে — আর আমরা একনায়কতন্ত্র চাই না। আমরা ঘৃণা চাই না। আমরা বন্দুক চাই না। আমরা ভালোবাসার দেশ চাই।’ লুলার ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী সমাবেশগুলোর একটিতে আসা বিপুল মানুষের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এবারের সমাবেশটি ব্রাজিলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়, এবং লুলা ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জিতবেন।
জরিপগুলো অবশ্য অনেক কম ব্যবধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মতে, বলসোনারোই সামান্য এগিয়ে আছেন — তিনি নিজেকে এমন একজন হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি লোহার মুঠিতে দীর্ঘদিনের ভয়াবহ অপরাধ দমন করবেন। বলসোনারোর বাবা জাইর বলসোনারো ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লুলা যেন আবার উদ্যোগ ফিরে পেয়েছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘিরে ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির খবরের মধ্যে জরিপে উঠে এসেছেন। গত সপ্তাহে ব্রাজিলের পিয়াউই পত্রিকা দাবি করে, ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সময়ে ফ্লাভিও বলসোনারো একটি নৌকা-পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে যৌনকর্মী ও টিকা-লবিস্টরা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর বাবার সরকারের সঙ্গে চুক্তির আশা করছিলেন।
কোপাকাবানার সমাবেশে কর্মীরা বিশাল হলুদ-সবুজ ব্যানার মেলে ধরেন, যাতে লেখা ছিল — ‘আমরা এই ফল উল্টে দেব!’ ৫৯ বছর বয়সী রেস্তোরাঁ মালিক মার্তা মোরায়েস সমাবেশে যোগ দিয়ে বলেন, ‘আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। লুলাই জিতবে।’
মোরায়েস বলেন, এই নির্বাচন বাম বনাম ডানের লড়াই নয়। ‘ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে আমাদের কিছু নেই... আমরা যার বিরুদ্ধে, তা হলো বলসোনারোবাদ,’ বলেন তিনি — চোখে পানি নিয়ে স্মরণ করেন, কীভাবে ফ্লাভিওর বাবা তাঁর বিশৃঙ্খল ২০১৯-২০২২ প্রশাসনে কোভিড মোকাবিলায় গাফিলতি করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বলসোনারোর অবহেলায় আমি আমার পরিবারের চারজনকে হারিয়েছি।’
জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ব্রাজিলের অনেক গণতন্ত্রপন্থীর আশঙ্কা, তাঁর ছেলে জিতলে তিনি মুক্তি পাবেন, এমনকি সরকারে ফিরতেও পারেন। ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এখন কারাগারে বা নির্বাসনে লুকিয়ে থাকা তাঁর কয়েকজন সহ-ষড়যন্ত্রকারী বলসোনারো প্রশাসনে শীর্ষ সামরিক ও পুলিশ পদ পেতে পারেন।
৪৯ বছর বয়সী ডিজে ও কর্মী ক্যামি মারিনহো বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি গণতন্ত্রকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে — বলসোনারো পরিবার সেটাই চায়।’ তিনি জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি বলসোনারোকে ভোট দেওয়া বা প্রথম পর্বে ভোট না দেওয়া মানুষদের লুলাকে সমর্থনে রাজি করাতে লড়ছেন — ‘বেকারিতে, সুপারমার্কেটে, মেট্রোতে — যেখানেই কথা বলার সুযোগ পাই।’
সমাবেশের অনেকেই ছিলেন তথাকথিত ‘লুলার সেনাবাহিনীর’ অংশ — প্রথম পর্বের পর ফল উল্টে দেওয়ার আশায় গঠিত এক কোটি সদস্যের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। ৬৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইসাবেলা গেজ বলেন, ‘লুলার সেনাবাহিনীর সৈনিক হওয়া মানে ব্রাজিলের গণতন্ত্রের জন্য লড়াই। এটা কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়।’ সমাবেশে ছিলেন ১৪ বছর বয়সী হুইলচেয়ার-ব্যবহারকারী হেইতোর লোপেস দা সিলভাও, দুকে দে কাশিয়াস শহর থেকে আসা, হাতে ফেস্টুন — ‘লুলা, আমি একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং আমি আপনাকে সমর্থন করতে এখানে এসেছি।’
অন্যদিকে বলসোনারোর সমর্থকেরাও বড় সংখ্যায় রাস্তায় নেমেছেন, যার মধ্যে রয়েছে মিনাস জেরাইস রাজ্যের রাজধানী বেলো হরিজন্তে। সাও পাওলোর পর এই রাজ্যেই দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটারগোষ্ঠী, এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক — কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই মিনাস জেরাইস না জিতে প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি; প্রথম পর্বে সেখানে বলসোনারো এগিয়ে ছিলেন ৫ শতাংশের কিছু কম ব্যবধানে। রোববারের ভোটেই এখন ঠিক হবে, কোপাকাবানার এই জনসমুদ্র লুলার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনে রূপ নেয়, নাকি বলসোনারো পরিবারই ফিরে আসে ক্ষমতায়।





