বদলে যাচ্ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সমীকরণ: গ্যাস রপ্তানিকারক কাতারই এখন কিনছে মার্কিন এলএনজি, তেল ছয় মাসের সর্বোচ্চে
ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোয় ভয়াবহ হামলা এবং বাণিজ্যিক নৌপথের চরম নিরাপত্তাহীনতায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে ঘটেছে নজিরবিহীন ঘটনা—বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গ্যাস রপ্তানিকারক কাতার এখন নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে ৪০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি। এতদিন গ্যাস বিক্রিতে শীর্ষে থাকা কাতার এবার আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে আমেরিকার দ্বারস্থ হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন গ্যাস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চেনিয়ার এনার্জির সঙ্গে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জির একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০৫৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪ মিলিয়ন (৪০ লাখ) মেট্রিক টন এলএনজি কিনবে কাতার। হেনরি হাবের বাজারদরের সঙ্গে নির্দিষ্ট ফি যোগ করে গ্যাসের দাম নির্ধারিত হবে এবং ২০৩০-এর দশক থেকে সরবরাহ শুরু হবে। এ ছাড়া কাতারএনার্জি মার্কিন আরেক প্রতিষ্ঠান ভেঞ্চার গ্লোবালের কাছ থেকে বছরে আরও ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন গ্যাস কেনা নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে এবং সম্প্রতি পাওয়া ৩০০ কোটি ডলারের চীনা ঋণ দিয়ে আরও মার্কিন গ্যাস কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে কাতারের উৎপাদনকেন্দ্রে ইরান যুদ্ধের সরাসরি আঘাত। দেশটির প্রধান গ্যাস উৎপাদনকেন্দ্র রাস লাফানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলায় কাতারএনার্জির দুটি প্রধান উৎপাদন লাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে কাতারের মোট এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে।
কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। বর্তমানে কাতার আন্তর্জাতিক আইনের ফোর্স ম্যাজিউর নীতির আওতায় দায়মুক্তির আবেদন করছে। এর ওপর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় এবং বিকল্প সমুদ্রপথ না থাকায় ভৌগোলিক কারণে কাতার এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট মার্কিন এলএনজি খাতের ওপর নির্ভরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সংকট শুরুর পর থেকে মার্কিন কোম্পানি চেনিয়ার এনার্জি ও ভেঞ্চার গ্লোবালের শেয়ারের দাম যথাক্রমে ২৬ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবায়নাধীন বিশাল এলএনজি প্রকল্পগুলোর কারণে আগামী দিনে বিশ্ব গ্যাস বাজারে তাদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি তেলের বিশ্ববাজারেও আগুন লেগেছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা এবং তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছয় মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বা ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গত ২৯ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। মার্কিন অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার ২৭ সেন্টে। গত এক সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম মোট ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
তেলের দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণ। গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরামকো ধাহরানে অবস্থিত তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইন উপকূলে একটি জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে এবং গত ৯ অক্টোবর জেম নম্বর ২ নামের একটি সুপারট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। লিবিয়ার হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্রের পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ লুইজিয়ানার শোধনাগারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কৌশলগত মজুত থেকে চার লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছে, যা দেশটির মজুতকে ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। জি-৭ দেশগুলোর সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে জার্মানিও তাদের জাতীয় মজুত থেকে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হলেও সংঘাত কীভাবে প্রশমিত হবে, তা এখনো বিবেচনাধীন। অর্থাৎ যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি, আর সেই অনিশ্চয়তাই বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত সমাধান না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও রেকর্ড মূল্যস্ফীতির ছায়া নামতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে পরিবহন, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের দামে—বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য যা বাড়তি চাপের কারণ হবে।
সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পুরনো সমীকরণ ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। রপ্তানিকারক কাতারের আমদানিকারক হয়ে ওঠা সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ও ইরান যুদ্ধের গতিপথই এখন ঠিক করবে, এই অস্থিরতা কত দিন স্থায়ী হয়।



