সাভারে ধর্ষণ মামলার বাদীকেই আসামি করে পাল্টা মামলা: ৭৭ লাখ টাকার লুটের অভিযোগ, ক্ষোভ পরিবারে
সাভারে ১৩ বছরের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ও মালিক আব্দুল বারীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদীকেও এবার আসামি করা হয়েছে। মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে দায়ের করা নতুন মামলায় ধর্ষণ মামলার বাদীসহ মোট ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সাভার মডেল থানায় মামলাটি করেন ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি আব্দুল বারীর (৫০) বড় ছেলে মো. উমায়ের। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, বাকি ১৫ জন অজ্ঞাতনামা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোশাররফ হোসেন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, মামলায় মাদ্রাসা থেকে নগদ ৪৭ লাখ টাকা, ২৩ লাখ টাকা মূল্যের ১২ ভরি স্বর্ণালংকার এবং সাত লাখ টাকা মূল্যের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগ আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে অভিযোগ করা লুটের পরিমাণ ৭৭ লাখ টাকা।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলায় নাম উল্লেখ করা ছয়জনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বাদী ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর দাদাও রয়েছেন। ওপর মহলের চাপে এবং বাদীর ইচ্ছা অনুযায়ী ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলাটি নথিভুক্ত করতে হয়েছে পুলিশকে—এমন দাবিও ওই সূত্রের।
ধর্ষণ মামলার বাদীকে লুটপাটের মামলায় আসামি করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ধর্ষণ মামলার বাদীকে আমরা মাদ্রাসায় লুটপাটের মামলায় আসামি করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে আসামি করবে। আমরা তদন্ত ছাড়া তাকে গ্রেফতার করবো না।’
নতুন মামলার বাদী মো. উমায়ের নিজেকে মাদ্রাসার পরিচালনা সহকারী দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মাদ্রাসার জায়গাজমি দখল ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে এই অভিযোগ তুলে ওই রাতে মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
মো. উমায়ের বলেন, ‘ধর্ষণের যে মামলাটি করা হয়েছে, সেটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মাদ্রাসার জায়গাজমি দখল ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার বাবার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে ওই রাতে আমাদের মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ ৭৭ লাখ টাকার মালামাল মাদ্রাসা থেকে লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা ভাঙচুর করে আরও কোটি টাকার ওপরে ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।’ গত কয়েক বছর ধরে একটি পক্ষ মাদ্রাসার জায়গাজমি লুটপাটের চেষ্টা করছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় ধর্ষণ মামলার বাদীকে আসামি করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ১৩ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীর স্বজনেরা। ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি আব্দুল বারীকে পুলিশ এখনও গ্রেফতার না করায়ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার। ধর্ষণের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সন্ধ্যায় এলাকাবাসী মাদ্রাসাটি ঘেরাও করেন। খবর পেয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিরুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। তখন এলাকাবাসীর তোপের মুখে পুলিশ সদস্যরা মাদ্রাসার ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
পরে পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাত পৌনে ৯টার দিকে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী ও ছেলেকে উদ্ধার করে পুলিশ সদস্যরা দ্রুত থানার দিকে রওনা হন। এরপর এলাকাবাসী দ্বিতীয় দফায় মাদ্রাসায় ভাঙচুর চালান এবং ভেতরে থাকা মালামাল লুট করে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে এখন একই ঘটনা ঘিরে দুই পক্ষের দুটি মামলা—একদিকে ১৩ বছরের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ, অন্যদিকে ভাঙচুর ও ৭৭ লাখ টাকার লুটপাটের পাল্টা অভিযোগ। দুটি অভিযোগেরই সত্যতা এখন তদন্তের বিষয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবারের ক্ষোভ আর পুলিশের ‘তদন্ত ছাড়া গ্রেফতার নয়’ অবস্থানের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপই এখন সবার নজরে। বিশেষ করে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি এখনও গ্রেফতার না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।





