সাঈদীর মামলার সাক্ষী মানিক পশারীর দাফন নিয়ে পিরোজপুরে উত্তেজনা, গার্ড অব অনারের পর মরদেহ পুলিশ লাইনসে
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে পিরোজপুরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। শনিবার তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার পর তাঁর মরদেহ জেলা পুলিশ লাইনসে রাখা হয়েছে, আর শহরে এই দাফন ঘিরে দুই ধরনের অবস্থান সামনে এসেছে।
মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানে দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে মানিক পশারীর মরদেহ নিয়ে স্বজনেরা প্রথমে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদে আসেন। এরপর মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় এই সম্মান জানানোর পরই দাফনের স্থান নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়।
এদিকে মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন না করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় কিছু লোক। এ ছাড়া শনিবার শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতেও দেখা গেছে। এই অবস্থানের কারণে শহরে একধরনের সতর্ক পরিবেশ তৈরি হয়, যদিও কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পুরোনো একটি মামলার ইতিহাস। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। মানিক পশারী সেই মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাঈদী মারা যান। সেই মামলার সাক্ষীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফন ঘিরেই এখন নতুন করে বিতর্ক সামনে এল।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছি, যাতে কেউ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে জামায়াতের ওপর দায় চাপাতে না পারে। একজন মানুষ মারা গেছেন, তাঁর দাফনের বিষয়ে আমাদের কোনো বাধা নেই।’ তাঁর এই বক্তব্যে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
তবে আবদুর রাজ্জাক একই সঙ্গে দাবি করেছেন, মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা নন। তবু তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ করেছেন তাঁরা। অর্থাৎ তাঁদের আপত্তি মূলত রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো নিয়ে, দাফন নিয়ে নয় — এমনটাই তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এই দাবি ও প্রতিবাদই উত্তেজনার একটি বড় অংশ।
অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা পিরোজপুরেই মানিক পশারীর দাফনের চেষ্টা করছেন। নিজ গ্রামের মাটিতে তাঁকে দাফন করাই পরিবারের ইচ্ছা। কিন্তু স্থানীয় একাংশের দাবি ও শহরে অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে, ফলে গার্ড অব অনারের পরও মরদেহ পুলিশ লাইনসেই থেকে গেছে।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম শনিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে জানিয়েছেন, ‘গার্ড অব অনার দেওয়ার পর মানিক পশারীর মরদেহ এখনো পুলিশ লাইনসের ভেতরে রয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যরা পিরোজপুরে দাফনের চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি শান্ত হলে এবং এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানানো যাবে।’
পুলিশের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখা প্রশাসনের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে, আর ততক্ষণ পর্যন্ত মরদেহের অবস্থান পুলিশ লাইনসেই থাকছে। পরিবার, স্থানীয় লোকজন ও রাজনৈতিক অবস্থান — তিন পক্ষের ভূমিকাই এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা ঠিক করবে।
এখন সবার নজর প্রশাসনের পরবর্তী নির্দেশনার দিকে। নির্দেশনা এলে দাফনের স্থান ও সময় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষীর শেষকৃত্য ঘিরে তৈরি এই উত্তেজনা শান্তভাবে মিটবে কি না, সেটাই এখন পিরোজপুরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।





