বল প্রয়োগ করলে ‘ফ্যাসিবাদী’, না করলে ‘দুর্বল’—পুলিশের এই দ্বিধার কথা বললেন আইজিপি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বল প্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বল প্রয়োগ না করলে মানুষ পুলিশকে দুর্বল মনে করে—এমন মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। পুলিশ ও জনগণের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
শনিবার খুলনার বয়রা পুলিশ লাইনে খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব মন্তব্য করেন। বিভাগজুড়ে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এই সমাবেশের পর তার বক্তব্য পুলিশের ভূমিকা ও জনআস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
আইজিপি বলেন, গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে মাদককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশ কাজ করছে বলে তিনি জানান।
তার বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ এক ধরনের দ্বিমুখী চাপের মধ্যে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হলেই সমালোচনা আসে, আবার নমনীয় হলে বাহিনীকে দুর্বল ভাবা হয়। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে হয় পুলিশ সদস্যদের।
আইজিপি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশের একটি নিয়মিত শাখা হিসেবে কাজ করবে, বিচ্ছিন্ন কোনো কার্যক্রম হিসেবে নয়।
কমিউনিটি পুলিশিংকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এই উদ্যোগকে তিনি পুলিশ ও জনগণের দূরত্ব কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে তুলে ধরেন। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়লে অপরাধ প্রতিরোধ ও তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে বলেও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চলমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। এই তিন ধরনের অপরাধকে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলো দমনে সমন্বিত অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।
পাশাপাশি চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও জানান আইজিপি। প্রস্তাবিত উদ্যোগ অনুযায়ী, চাঁদাবাজির অভিযোগে জনগণের অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার ক্ষমতা পেতে পারে। ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে অভিযোগ করতে এগিয়ে আসেন না—এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এমন ক্ষমতার প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মাদক প্রসঙ্গে আইজিপির বক্তব্য ছিল স্পষ্ট: সমাজে মাদককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, অর্থাৎ মাদকের বিস্তার এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পুলিশ কাজ করছে বলে তিনি জানান, যদিও সেই কাজে জনগণের সহযোগিতা ছাড়া সফল হওয়া কঠিন বলেও তার কথায় ফুটে ওঠে।
খুলনা বিভাগের এই সুধী সমাবেশে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়। আইজিপির বক্তব্যে বারবারই ফিরে আসে জনসম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ—পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই যে বাহিনীর সামনে এখন প্রধান কাজ, তা তার কথায় স্পষ্ট হয়।
বল প্রয়োগ নিয়ে তার ‘ফ্যাসিবাদী’ বনাম ‘দুর্বল’ মন্তব্যটি পুলিশের কাজের ধরন নিয়ে চলমান জনবিতর্কের প্রতিফলন। একদিকে বাহিনীর কঠোরতার সমালোচনা, অন্যদিকে অপরাধ দমনে দৃঢ় পদক্ষেপের জনদাবি—এই দুই বিপরীত প্রত্যাশার ভারসাম্য রক্ষা করাই পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আইজিপির বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আইনি কাঠামোর খসড়া ও প্রস্তাবিত নতুন আইনের উদ্যোগ কবে নাগাদ চূড়ান্ত রূপ পায় এবং কমিউনিটি পুলিশিং কবে পুলিশের নিয়মিত শাখা হিসেবে কাজ শুরু করে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে চলমান যৌথ অভিযানের ফলাফলও পরিস্থিতি মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে।




