জর্ডানের গির্জায় হামলায় নিহত বেড়ে ৭, আহত ৪০: কারাকে গেলেন বাদশাহ আবদুল্লাহ, নিন্দা জাতিসংঘেরও
জর্ডানের কারাক প্রদেশের হামুদ গির্জায় শেষকৃত্যানুষ্ঠান চলাকালে বন্দুকধারীদের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত সাতজনে দাঁড়িয়েছে, আহত হয়েছেন ৪০ জন। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই হামলাকে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্য করে চরমপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর পরিকল্পিত ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করেছে জর্ডান সরকার।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) আল-মুশাইরফেহ এলাকার ওই গির্জায় হামলাটি ঘটে। শেষকৃত্যে বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন; প্রত্যক্ষদর্শী খালেদ বুর্কান জানান, হামলাকারীরা বেশ কয়েক মিনিট ধরে উপস্থিতদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে গির্জার প্রবেশদ্বারের মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা গেছে।
জর্ডানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আল-মামলাকা প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ফুটপাত থেকে নিরাপত্তা প্রাচীর ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে অন্তত তিনজন বন্দুকধারী গির্জা লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। এরপর তারা দ্রুত গির্জার প্রবেশপথের দিকে ধেয়ে যায়।
হামলায় জড়িত বন্দুকধারীদের ধরতে জর্ডানজুড়ে ব্যাপক চিরুনি অভিযান শুরু করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিরাপত্তা বাহিনীর এই অভিযান চলার মধ্যেই হামলার তদন্তও এগিয়ে চলেছে।
ঘটনার পরপরই কারাক সফর করেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘কারাকে এই সন্ত্রাসী হামলার যোগ্য জবাব দেওয়া হবে। যারা মনে করে বুলেটের আঘাতে জর্ডানের জনগণকে বিভক্ত করা যাবে, আমাদের ঐক্যের সামনে তাদের সেই দুরাশা কোনোদিন সফল হবে না।’ হামলাকারীদের ‘লৌহহস্তে’ দমন করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
জর্ডানের পাবলিক সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের প্রধান মেজর জেনারেল আবদুল্লাহ আল-মাইতাহ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিন আল ফারেহ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানান, হামলাটি চরমপন্থিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তবে এতে কোনো আন্তর্জাতিক বা দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।
প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘এটি অন্ধ চরমপন্থা ও সন্ত্রাসী আদর্শের পরিণতি। কোনো অবস্থাতেই আমাদের সমাজকে এই পথ অনুসরণের সুযোগ দেওয়া হবে না।’
আন্তর্জাতিক মহল থেকেও নিন্দার ঝড় উঠেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সাধারণ নাগরিক এবং প্রার্থনালয়ে এই ধরনের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’ জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ হামলাটিকে একটি ‘বর্বর ও ঘৃণ্য আক্রমণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
জর্ডানের মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলক শান্ত ও স্থিতিশীল হলেও দেশটিতে বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময় ইসলামপন্থি চরমপন্থিদের হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার দাবি করে আসছে নিরাপত্তা বাহিনী। সেই প্রেক্ষাপটে প্রকাশ্য একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এমন হামলা দেশটিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। ফলে হামলাকারীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে, আর তদন্তকারীরা এখন আন্তর্জাতিক বা দেশীয় কোনো জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সূত্র খুঁজছেন।
আহত ৪০ জনের চিকিৎসা চলছে; হামলাকারীদের ধরতে চলমান দেশজোড়া অভিযান ও তদন্তের অগ্রগতির দিকেই এখন সবার নজর। সরকারের পক্ষ থেকে ঐক্য ধরে রাখার বার্তা দেওয়া হলেও কারাকের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক এখনো কাটেনি।





